আমার জন্য প্রতিটি দিনই নৃত্য দিবস: পূজা সেনগুপ্ত

· Prothom Alo

আজ বিশ্ব নৃত্য দিবস। এ উপলক্ষে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন দেশের বর্তমান প্রজন্মের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত। উদ্‌যাপন না আত্মসমালোচনা, গুরু-শিষ্য সম্পর্ক থেকে ‘ভাইরাল’ নাচ—নৃত্যের নানা প্রসঙ্গে তাঁর ভাবনায় উঠে এসেছে নাচের অতীত, বর্তমান ও সম্ভাবনার এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র।

Visit djcc.club for more information.

শুভেচ্ছা আপনাকে। বছর ঘুরে নৃত্য দিবস আসে। আপনার নিজের কাছে এ দিনটির তাৎপর্য জানতে চাই

পূজা সেনগুপ্ত : আমার জন্য প্রতিটি দিনই নৃত্য দিবস। তবে এই দিনটির একটা বিশেষ তাৎপর্য হলো একাত্মতা। বিশ্বজুড়ে সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির শিল্পীরা মিলে একটা সর্বজনীন নিঃশব্দ ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করি—এ ভাষাটাই মূলত নাচ বা নৃত্য!

আপনার সময়ে নাচ শেখা আর এখনকার প্রজন্মের শেখার পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?

পূজা সেনগুপ্ত : আমি কিন্তু এখনো শিখছি। তাই আমি এভাবে বলব যে আগে আমরা যেভাবে শিখতাম, তার মূল ভিত্তি ছিল অনুকরণ। গুরু বা শিক্ষক যা করে দেখাচ্ছেন, সেটাকে হুবহু নিজের শরীর দিয়ে প্রকাশ করা। কিন্তু এখন আমি শুধু শেখাই না, আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখি। পার্থক্যটা এখানেই। বর্তমান সময়ে শেখা ও শেখানো উভয়মুখী আর এখানে অনুকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাবনার আদান–প্রদান এবং নিজস্বতা। আমি কখনোই চাইব না আমার শিক্ষার্থীরা হুবহু আমার মতো হোক; বরং চাইব আমার ভাবনার নির্যাস নিয়ে তারা নিজের মতো করে গড়ে উঠুক। ব্যক্তিজীবনে আমার নিজস্ব এই পেডাগোজি আমাকে সহায়তা করেছে জেন–জি ও জেন–আলফার কাছে পৌঁছাতে। আমি ওদের শিক্ষক না হয়ে বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করেছি। সব সময় চেষ্টা করি ওদের প্রজন্মের আবেগগুলোকে বুঝে নিজের প্রজন্মের আদর্শগুলোকে যেন ওদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি। আমি এটাকে ফিউশন বলি না, বলি ইভোলিউশন!

পূজা সেনগুপ্ত

গুরু-শিষ্য পরম্পরা এখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এটা কি বদলে যাচ্ছে?

পূজা সেনগুপ্ত : গুরু আর শিক্ষকের পার্থক্যটা আগে বুঝতে হবে। গুরু নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে আমাদের জীবনকে আলোকিত করেন। গুরু যেটা শেখান, সেটা একেবারেই তাঁর নিজস্ব গবেষণালব্ধ জ্ঞান। আর শিক্ষক আমাদের যে জ্ঞান দেন, সেটা তাঁর নিজস্ব না; তিনি নিজেও কারও কাছ থেকে এটা শিখেছেন। তাই গুরু–শিষ্য সম্পর্কের আবেদন চিরন্তন। আমরা অনেক সময় নিজের সত্যিকারের গুরুকে চিনতেও পারি না, শিক্ষকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ নাচ—এটা কি শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে, নাকি হালকা করে দিচ্ছে?

পূজা সেনগুপ্ত : শিল্পীদের কাজের স্বাধীন ও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হলো সোশ্যাল মিডিয়া। আর সময়ের স্রোতে টিকবে শুধু সত্যিকারের শিল্প। হালকা কাজগুলো এমনিই হারিয়ে যাবে। প্রজন্ম সব সময় ভালো কাজগুলোকেই গ্রহণ করে আর হালকা কাজ নিয়ে হবে হাসাহাসি বা ট্রল!

বাংলাদেশের নাচ কি তার নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখতে পারছে নাকি গ্লোবাল স্টাইলের প্রভাব বেশি?

পূজা সেনগুপ্ত : আমি মনে করি, শিকড় শক্ত থাকলে গ্লোবাল স্টাইল আমাদের আরও সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশে আমরা ড্যান্স থিয়েটার বা আধুনিক নৃত্যের মধ্য দিয়ে নিজেদের গল্প বলার চেষ্টা করছি। বৈশ্বিক স্টাইল গ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই, তবে তা যেন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নির্যাসকে ম্লান করে না দেয়।

নৃত্য পরিবেশনরত অবস্থায় পূজা সেনগুপ্ত ও তুরঙ্গমী নৃত্যদল

মঞ্চভিত্তিক পারফরম্যান্স ও স্ক্রিন (রিলস/ভিডিও)—কোনটি বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন?

পূজা সেনগুপ্ত : মাধ্যম যা–ই হোক, ভালো কাজ করা সব সময় চ্যালেঞ্জিং। তবে মঞ্চে কোনো ‘রিটেক’ নেই। সেখানে দর্শকের সঙ্গে শিল্পীর একটা সরাসরি এনার্জি বা শক্তির আদান-প্রদান ঘটে, যা স্ক্রিনে সম্ভব নয়। ভিডিও বা রিলসে সম্পাদনার সুযোগ থাকে, কিন্তু মঞ্চে শিল্পীকে তাঁর সর্বোচ্চ একাগ্রতা নিয়ে উপস্থিত থাকতে হয়।
দেড় মিনিটের রিলসে পরিমিতিবোধ হতে হয় মারাত্মক লেভেলের। আর এটা ফোন খুললেই দর্শকের কাছে ধরা দেয়। কিন্তু দেড় ঘণ্টার একটা পারফরম্যান্স দিয়ে দর্শককে ধরে রাখা, তাঁকে ঘর থেকে বের করে দর্শনী কেনার লাইনে এনে দাঁড় করাতে পারার জন্য একজন শিল্পী বা নির্দেশকের যে অরা (দীপ্তি) থাকতে হয়, সেটা সময়, শ্রম, মেধা ও অধ্যবসায় সাপেক্ষে।

নৃত্যশিল্পীদের জন্য পেশা হিসেবে নাচ এখন কতটা নিরাপদ, মানে কতটা নির্ভরতার? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

পূজা সেনগুপ্ত : আমি বলব, পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। এখন শুধু পারফরম্যান্স নয়, কোরিওগ্রাফি, গবেষণা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং একাডেমিকভাবেও নাচে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। আমার অভিজ্ঞতা বলে, যদি পেশাদারত্ব আর মেধার সমন্বয় ঘটে, তবে নাচ এখন একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও নির্ভরতার পেশা।

পূজা সেনগুপ্ত

নারী নৃত্যশিল্পীদের জন্য পরিস্থিতি কি এখন আগের চেয়ে সহজ হয়েছে? কী কী পরিবর্তন দেখছেন?

পূজা সেনগুপ্ত : নারীদের জন্য ক্ষেত্রটি এখন অনেক বেশি প্রশস্ত। সমাজ এখন নাচকে শুধু শখ হিসেবে নয়, সৃজনশীল কর্ম হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। নারীরা এখন শুধু পারফরমার নন, তাঁরা নিজেরাই বড় বড় প্রোডাকশন পরিচালনা করছেন, ডিরেক্টর বা কোরিওগ্রাফার হিসেবে নেতৃত্বের জায়গায় আসছেন—এটি একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তন।

একজন নৃত্যশিল্পীর জন্য সবচেয়ে জরুরি—কৌশল নাকি অভিব্যক্তি? কেন?

পূজা সেনগুপ্ত : একজন নৃত্যশিল্পীর জন্য সবচেয়ে জরুরি তাঁর প্যাশন। কৌশল ছাড়া নাচ অপূর্ণ, আর অভিব্যক্তি ছাড়া নাচ প্রাণহীন বা যান্ত্রিক। কিন্তু এই দুইয়ের সমন্বয়ে সঙ্গে যদি শিল্পের প্রতি গভীর প্যাশন বা অনুরাগ যুক্ত হয়, তাহলেই একটা সার্থক শিল্পের জন্ম হবে।

নতুন প্রজন্মের নৃত্যশিল্পীদের জন্য আপনার এক লাইনের পরামর্শ।

পূজা সেনগুপ্ত : লোকের কথায় নয়, নাচ হোক সব সময় নিজের হৃৎস্পন্দনের তালে...

Read full story at source