৩ ঘণ্টায়, ৪ নারীর গল্পের ‘প্রেশার কুকার’ কতটা জমল

· Prothom Alo

তারকানির্ভর সিনেমা কিংবা একক চরিত্রকেন্দ্রিক গল্প—কিছু ব্যতিক্রম বাদে ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমা মানেই এই চিত্র। ‘সুড়ঙ্গ’, ‘তুফান’ থেকে ‘তাণ্ডব’—রায়হান রাফীও গত তিন বছর সে পথেই হেঁটেছেন। এবার ব্যতিক্রম। এই ঈদে ‘প্রেশার কুকার’–এ তিনি বলেছেন ভিন্ন পটভূমির চার নারীর গল্প।

Visit playerbros.org for more information.

হাইপারলিংক ন্যারেটিভে চারটি আলাদা জীবনকে তুলে ধরেছেন রাফী। পটভূমি ভিন্ন হলেও তাঁদের গল্প কোথাও যেন একসুতায় বাঁধা। হাইপারলিংক সিনেমা; অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন একাধিক চরিত্রের কাহিনি বা ঘটনা একটি সাধারণ থিম বা ঘটনার মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পশ্চিমের ‘পাল্প ফিকশন, ‘আমোরেস পেররোস’, ‘বাবেল’ বা ভারতের ‘সুপার ডিলাক্স’–এ এই ধরনের গল্প আমরা দেখেছি।

‘প্রেশার কুকার’কে সুনির্দিষ্ট জনরায় ফেলা যায় না। রোমাঞ্চ আছে, আবার ড্রামাও আছে। এতে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপ, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম। গল্পের কেন্দ্রে ভিন্ন পটভূমির চার নারী। রেশমা (নাজিফা তুষি) কাজ করে পিঙ্কভিলা ম্যাসাজ পারলারে। ঢাকা শহরে রেশমার থাকার নিজস্ব জায়গা নেই, ভাইয়ের বাসায় থাকে। ভাবির গঞ্জনা মুখ বুজে সহ্য করে। রেশমাকে পছন্দ করে তন্ময় (রিজভী রিজু); কিন্তু স্বামীর কথা ভেবে তন্ময়কে মেনে নিতে পারে না রেশমা।  
অনন্যা (মারিয়া হোসেন) কলেজপড়ুয়া ছাত্রী। অর্থের প্রলোভনে বয়স্ক এক লোকের সঙ্গে তাকে বিয়ে দিতে চায় তার বাবা। অনন্যা বিয়ে করতে চায় তার প্রেমিক শাকিলকে (ফাইজুল ইয়ামিন)।

একনজরেসিনেমা: ‘প্রেশার কুকার’ধরন: ক্রাইম-থ্রিলার, ড্রামাপরিচালক: রায়হান রাফীচিত্রনাট্য: সিয়াম শামস, মেহেদী হাসান ও রায়হান রাফীঅভিনয়: নাজিফা তুষি, শবনম বুবলী, মারিয়া শান্ত, স্নিগ্ধা চৌধুরী, ফজলুর রহমান বাবু, মিশা সওদাগর, শহীদুজ্জামান সেলিম, রিজভী রিজু, আজিজুল হাকিম, চঞ্চল চৌধুরী, আয়মন শিমলা, নাঈমা আলম মাহা।দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৫২ মিনিট

শহরের নামী রাজনীতিবিদ আদনান শাইখের (মিশা সওদাগর) স্ত্রী আজমেরী (শবনম বুবলী)। কিন্তু নিজের মত প্রকাশ করতে গেলেই তাকে নির্যাতিত হতে হয়।
আবার ইনফ্লুয়েন্সার রাকার (স্নিগ্ধা চৌধুরী) রয়েছে এক ভিন্ন গল্প। এদের গল্পের মধ্যেও রয়েছে আরও অনেক টুকরা টুকরা গল্প। এসব নিয়ে এগিয়ে যায় প্রেশার কুকার।

প্রেশার কুকার–এ পাঁচটি চ্যাপ্টারে গল্প বলেছেন রাফী। ‘চ্যাপ্টার ১: পরাণ–লাভ’, ‘চ্যাপ্টার ২: সুড়ঙ্গ-বিট্রেয়াল’, ‘চ্যাপ্টার ৩: তুফান–রাইজ’, ‘চ্যাপ্টার ৪: তাণ্ডব-কেওস’ ও ‘চ্যাপ্টার ৫: প্রেশার কুকার-দ্য কার্মা’। নামগুলো যেন তাঁর আগের সিনেমাগুলোকেই ট্রিবিউট করে। অধ্যায়ের নামের সঙ্গে সংগতি রেখে এগিয়েছে গল্প।

‘প্রেশার কুকার’–এর পোস্টার। ফেসবুক থেকে

সিনেমায় একটি চরিত্রকে আলাদা করে তুলে ধরার অবকাশ নেই। প্রতিটি চরিত্র একটি অন্যটির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত, যেন একে অন্যের পরিপূরক। তবে সিনেমাজুড়ে ছিল রেশমা। তাকে ঘিরেই সিনেমার গল্প ডালপালা মেলেছে। চরিত্রটিতে ক্যারিয়ার সেরা অভিনয় করেছেন তুষি। ভাইয়ের সংসারে থাকা অনাহূত বোন, পারলারের কর্মজীবী নারী, দূরে থাকা এক সন্তানের মা, পালিয়ে যাওয়া স্বামীকে খুঁজে বেড়ানো এক স্ত্রী আর পাখি হয়ে নতুন জন্ম নেওয়া এক নারী—সব মুহূর্তেই চরিত্রটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তুষি। অনেক দৃশ্যেই সংলাপ ছিল না, কিন্তু কথা বলেছে তাঁর চোখ। একটি দৃশ্যে চুলায় প্রেশার কুকার, সামনে দাঁড়িয়ে রেশমা—কোনো কিছু না বলেই চরিত্রটির ভেতরের দমবন্ধ অবস্থা বুঝিয়ে দিয়েছেন তুষি। আবার গাড়ির মধ্যে একটি দৃশ্যে বরকতের (শহীদুজ্জামান সেলিম) সঙ্গে চোখাচোখির দৃশ্যটিও দারুণ।

রেশমার সঙ্গে তার ভাইবউয়ের চরিত্রে আয়মন শিমলা, সহকর্মী সামিয়ার চরিত্রে নাঈমা আলম মাহাও ভালো ছিলেন। রিজভী রিজু দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তন্ময় চরিত্রের নানা বাঁক। একটি দৃশ্যে রেশমা যখন অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে, তখন রিজভী রিজুর অভিব্যক্তি ছিল অনবদ্য। রাজনীতিবিদের বউ এবং পরবর্তী সময়ে প্রভাবশালী চরিত্রে স্বল্প উপস্থিতিতেও ভালো করেছেন বুবলী।

মারিয়া শান্তও ছিলেন যথাযথ। তবে ইনফ্লুয়েন্সার চরিত্রে স্নিগ্ধা চৌধুরীর আরেকটু ভালো করার অবকাশ ছিল। ছোট চরিত্রে নজর কেড়েছেন ফাইজুল ইয়ামিন। তবে আলাদা করে বলতে হয় ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম আর আজিজুল হাকিমের কথা। পুলিশ চরিত্রটির ধূসরতা ফজলুর রহমান বাবু দারুণ বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সকালের নাশতা করতে করতে কল রেকর্ড শুনছেন, তাঁর সামনে পুরো ঘটনা ভিজ্যুয়ালাইজড হচ্ছে—দৃশ্যটির চিত্রায়ণ ভালো ছিল। তাঁর কণ্ঠে ‘পুলিশ এত খারাপ না’ বা ‘সুন্দর’ সংলাপগুলোতে মজা পেয়েছেন দর্শক।

গত কয়েক বছরে ঈদের সিনেমার নিয়মিত মুখ শহীদুজ্জামান সেলিম। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর চরিত্রটি থাকে অতিরঞ্জিত। কিন্তু এবার এক ড্রাইভারের চরিত্রে অল্প উপস্থিতিতেও ছাপ রেখেছেন। বিশেষ করে তাঁর কাশির কথা কে ভুলতে পারে। তবে আজিজুল হাকিমকে সিনেমার সবচেয়ে বড় চমক বললেও ভুল বলা হবে না। নেতিবাচক চরিত্রটি তিনি যেভাবে সামলেছেন, সেটা তারিফ করার মতো।
মিশা সওদাগর যথারীতি মানিয়ে গেছেন। অতিথি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয়ে মজা পেয়েছেন দর্শকেরা।

‘প্রেশার কুকার’–এর পোস্টার থেকে। ফেসবুক থেকে
সিনেমায় একটি চরিত্রকে আলাদা করে তুলে ধরার অবকাশ নেই। প্রতিটি চরিত্র একটি অন্যটির সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত, যেন একে অন্যের পরিপূরক। তবে সিনেমাজুড়ে ছিল রেশমা। তাকে ঘিরেই সিনেমার গল্প ডালপালা মেলেছে।

প্রথম থেকেই যেন দর্শককে একটা ‘ওয়াও মোমেন্ট’ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল ‘প্রেশার কুকার’। সিনেমার প্রথমেই রয়েছে রাফীর প্রিয় একটি লং টেক শট। ফ্লাইওভারের ওপর বাস দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু, শেষ পারলারে। প্রায় দুই মিনিট দীর্ঘ শটটি শুরুতেই দর্শকদের যেন বলে দেয়, সিট বেল্ট বেঁধে নাও, আরও চমক আসছে।

সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল দুর্দান্ত। নজর কাড়ে অ্যানামরফিক লেন্সের ব্যবহার। কালার গ্রেডিং পরিবর্তন করার মাধ্যমে কখনো কখনো চরিত্রদের দমবন্ধ অবস্থা বোঝানো হয়েছে। এ জন্য সিনেমার চিত্রগ্রাহক জোয়াহের মুসাব্বিরের বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য।  
এই সিনেমার সংলাপ ছিল বেশ সৃজনশীল। দুঃখের সংলাপে হাস্যরসাত্মক উপাদান যেমন ছিল, তেমনই দ্বৈত অর্থের সংলাপগুলো ছিল দারুণ। এমনকি পারলারে চলতে থাকা শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘পালাবি কোথায়’ সিনেমার দৃশ্যটিও এই সিনেমার মূল থিমের সঙ্গে মানানসই ছিল। শেষ দৃশ্য, যেখানে রেশমার মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুসন্তান টুকু দাঁড়িয়ে আছে, সামনে শর্ষের খেতে শত শত ‘মাদার ফিগার’। দৃশ্যটি দিয়ে তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’কে ট্রিবিউট দিয়েছেন রাফী। এটিকে সিনেমার অন্যতম সেরা মুহূর্ত বললেও ভুল হয় না।

শাকিব খান কি এবার পিছিয়ে গেলেন

এ সিনেমার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, প্রায় তিন ঘণ্টার এ সিনেমায় রাফী একটা মুহূর্তও একঘেয়ে লাগতে দেননি। কিছু ক্ষেত্রে ২-১টি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে মনে হয়। নির্মাতা চাইলেই কিছু জায়গার দৈর্ঘ্য আরেকটু কমাতে পারতেন।

আবহ সংগীত নিয়ে আলাদা করে বলা দরকার। শহরের দমবন্ধ পরিবেশ, নারীদের লড়াই, অনিশ্চয়তা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রুসলান রেহমান। বিভিন্ন সময়ে কেবল নারী কণ্ঠে হামিং ছিল, সেটাও শুনতে দারুণ লেগেছে। সিনেমার অনেকই দৃশ্যেই সংলাপ নেই, কোথাও আছে কেবল ছুটে চলা। কিন্তু সবই সিনেমার সঙ্গে মানানসই আবহে তুলে এনেছেন তিনি।

‘প্রেশার কুকার’–এ গানের ব্যবহারও দারুণ। গানের কথা, গায়কিতেও সিনেমার থিম বজায় রাখা হয়েছে। অংকন কুমারের কণ্ঠে ‘বড়াই করে’ আর মিঠুন চক্রর কণ্ঠে ‘ক্ষয়ে ক্ষয়ে’ শুনতে শুনতে পর্দার হাহাকারের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। দুটিই নিচু স্বরের গান, পর্দার গল্পের সঙ্গে গানগুলো যেন আবহ সংগীতের মতো বাজতে থাকে। সিনেমাজুড়ে পরিস্থিতি বুঝে র‍্যাপ গান ‘টুনটুনি’র ব্যবহারও ভালো ছিল। ‘টুনটুনি’ গানটি গেয়েছেন পল্লব ভাই ও তানভীর আহমেদ।

এ সিনেমার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, প্রায় তিন ঘণ্টার এ সিনেমায় রাফী একটা মুহূর্তও একঘেয়ে লাগতে দেননি। কিছু ক্ষেত্রে ২-১টি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে মনে হয়। নির্মাতা চাইলেই কিছু জায়গার দৈর্ঘ্য আরেকটু কমাতে পারতেন।
‘প্রেশার কুকার’–এর নাজিফা তুষি। ভিডিও থেকে

রাফীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, পর্দায় নারী চরিত্রদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। একাধিক নারী চরিত্রকেন্দ্রিক সিনেমা ‘প্রেশার কুকার’ তাই দেখার আলাদা কৌতূহল ছিল। এ সিনেমার নারীরা সব বাধা ভাঙতে চায়। কেউ কেউ পারে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পরিণতি নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। বাধা ডিঙাতে চাইলে কি এমন পরিণতিই নেমে আসবে?

আমাদের চারপাশের নারীদের এ গল্পগুলো হয়তো অনেকেরই জানা, কিন্তু কেউ সাহস করে বলে না। ঈদে এমন একটা সাহসী গল্প বলার জন্য নির্মাতার আলাদা ধন্যবাদ পাওনা।

Read full story at source