সোনার উচ্চ মূল্য, ভারতে এখন এক গ্রাম সোনার কদর

· Prothom Alo

উজমা বশির বেশির ভাগ রাতেই মাথার পাশে ফোন রেখে ঘুমান। মাঝেমধ্যে ঘুম ভাঙে, তবে বার্তা দেখার জন্য নয়; বরং গ্রীষ্মে তাঁর বিয়ে, তাই তিনি সোনার দামে নজর রাখছেন।

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শ্রীনগরে এক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেন ২৯ বছর বয়সী বশির। তাঁর ভাষ্য, সোনা শুধু অলংকার নয়; বরং সম্মানের প্রতীক। শ্বশুরবাড়িতে আপনার সম্পর্কে দৃষ্টভঙ্গি কী হবে, তা–ও অনেকটা নির্ভর করে এর ওপর। খবর আল জাজিরার

Visit livefromquarantine.club for more information.

কিন্তু বশিরের মাসিক আয় ১০০ ডলারের কম। তা সত্ত্বেও মা–বাবার ওপর চাপ না বাড়াতে নিজের উপার্জনেই বিয়ের গয়না কিনতে চান তিনি।

দক্ষিণ এশিয়ায় বিয়েশাদির অনুষ্ঠানে এখনো পিতৃতান্ত্রিক প্রথার প্রবল প্রভাব। সেখানে কনের বিয়ের সময় সোনা দেওয়ার রীতি দীর্ঘদিনের। এটি শুধু অলংকার নয়; বরং শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন, এমনকি সহিংসতার বিরুদ্ধে একধরনের সুরক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হয়। কেননা অনেক ক্ষেত্রে কনের পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের পণ দাবি করা হয়।

উজমা বশির বলেন, ‘নারীর কাছে কতটা সোনা আছে, সেটা দিয়েই অনেক সময় তাঁর গুরুত্ব নির্ধারিত হয়। আমার জন্য মা–বাবা অনেক কিছুই করেছেন। কিন্তু আমি একটি আংটিও কিনতে পারছি না। এর দাম আমার প্রায় তিন মাসের বেতনের সমান।’

নাটকীয় পরিবর্তন

এ বছর সোনার রেকর্ড দামের কারণে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে গয়নার বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে উঠেছিল, বর্তমানে যা প্রায় ৪ হাজার ৮৬১ ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা ভোক্তা দেশ ভারতে সম্প্রতি অক্ষয় তৃতীয়া উৎসব উদ্‌যাপিত হয়েছে। এই সময় ১০ গ্রাম সোনার আগাম মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৭০ ডলার, আগের বছরের তুলনায় যা ৬৩ শতাংশ বেশি।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে স্বর্ণালংকারের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমেছে।

মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিয়ের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন এসেছে। স্বর্ণকারেরা বলছেন, ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখন খাঁটি সোনার বদলে নকল গয়না, সোনার প্রলেপ দেওয়া অলংকার বা কম ক্যারেটের সোনা কিনছেন।

উজমা বশিরের মতো অনেকেই এখন ‘ওয়ান গ্রাম গোল্ড জুয়েলারি’ নামে নতুন ধারণা নিয়ে এসেছেন। বিষয়টি হলো, বেজ মেটাল বা সাধারণ ধাতুর ওপর ২৪ ক্যারেট সোনার পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়।

বিষয়টি তাঁর কাছে জীবন রক্ষাকারীর মতো বলে উল্লেখ করেন উজমা। বলেন, ‘এখন আমি বিয়ের দিন এটি পরতে পারব, কেউ আঙুল তুলতে পারবে না।’ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক পরিবার এখন এই পথ বেছে নিচ্ছে।

নয়াদিল্লির লক্ষ্মীনগরের বাসিন্দা ফাতিমা বেগম করোল বাগের ব্যস্ত বাজারে নকল গয়নার দোকানে ঘুরছেন। পাঁচ সন্তানের এই মা–ও এক গ্রাম সোনার গয়না খুঁজছেন।

‘নয়াদিল্লির মধ্যবিত্ত পরিবার কতটুকু সোনা কিনতে পারে’—প্রশ্ন করেন ফাতিমা বেগম। বলেন, ‘আমার ছোট মেয়ের বিয়ে। খরচ কমাতে আসল সোনার বদলে এক গ্রাম গয়না নিচ্ছি। বড় মেয়ের বিয়েতেও একই কাজ করেছি।’

ফাতিমা জানান, ১৯৯৬ সালে তাঁর বিয়ের সময় বাবা প্রায় ৬০ গ্রাম সোনা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন নিজের মেয়ের বিয়েত তার অর্ধেকও দিতে পারছেন না তিনি। বলেন, ‘কিছু পুরোনো গয়না আর কিছু এক গ্রাম গয়না দিয়েছি, যাতে লজ্জার মধ্যে পড়তে না হয়।’

মুম্বাইয়ের জাভেরি বাজারে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেন স্বর্ণকার শিব যাদব। তিনি বলেন, বাজার এখন ক্রমেই কৃত্রিম গয়নার দখলে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘১০ জন ক্রেতার মধ্যে সোনা কেনেন একজন, বাকিরা নকল গয়না খোঁজেন। এত বড় পরিবর্তন আগে দেখিনি।’

সোনা

নকল গয়নার উত্থান

বাংলাদেশেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে আল–জাজিরার সংবাদে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে বাংলাদেশের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ হাজার ২০০ ডলারে উঠেছিল (এখন ২ হাজার ৩৪ ডলার)। যে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার ( ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে ২ হাজার ৬০০ ডলার), সেই দেশে সোনার এই দাম এখন অনেকের নাগালের বাইরে।

ঢাকার চকবাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে সাদিয়া ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মায়েরা যেভাবে সোনা পরতেন, এখন আর সেভাবে পরা সম্ভব নয়। সোনা খুবই ব্যয়বহুল হয়ে গেছে।’

চকবাজারের হাজী সেলিম টাওয়ারে ১০০টির বেশি গয়নার দোকান রয়েছে। এখানকার ব্যবসায়ী এনায়েত হোসেন জানান, সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় নকল গয়নার চাহিদা বেড়েছে। ছোট কানের দুল ২০০-৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, বড় সেট কয়েক হাজার টাকায়।

এনায়েত হোসেন আরও বলেন, ক্রেতারা এমন গয়না চান, যা দেখতে আসল সোনার মতো, কিন্তু দাম কম। ডিজাইনেও বৈচিত্র্য চান। তাঁর অনেক পণ্যই ভারত থেকে আমদানি করা।

সাদিয়া ইসলামের জন্য নিরাপত্তাও বড় বিষয়। বলেন, ‘বিয়ের অনুষ্ঠানে আসল সোনা পরে গেলে যদি চুরি হয়, আমি সেই ঝুঁকি নিতে চাই না।’

তাই পরিবারের অনুষ্ঠানের আগে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে নকল গয়না কেনেন সাদিয়া। তিনি আরও বলেন, ‘এতে আমি অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করি।’

ধনীদের জন্য সোনা

পাকিস্তানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে সংবাদে বলা হয়েছে। স্বর্ণকারেরা বলছেন, খাঁটি সোনা এখন মূলত ধনীদের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, গত এক বছরে স্বর্ণালংকার বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। অনেকেই ১৮ বা ১২ ক্যারেট সোনা কিনছেন, আবার কেউ কেউ পুরোপুরি সোনা ছেড়ে প্রলেপ দেওয়া গয়নার দিকে ঝুঁকছেন।

পাকিস্তানের ক্রেতা আয়েশা খান বলেন, ‘আমরা সোনা পরতে চাই না—এমন নয়, কিন্তু পাকিস্তানের পরিস্থিতি এখন খুব কঠিন।’

সেখানে প্রতি তোলা (ভরি) সোনার দাম প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার রুপি (১ হাজার ৯৩৮ ডলার)। আয়েশা খান বলেন, এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে আগের মতো গয়না কেনা অসম্ভব।

আয়েশা বলেন, নকল গয়না এখন ঐতিহ্যের রূপ ধরে রাখার উপায়। এতে কম খরচে বিয়ের অনুষ্ঠানে সাজগোজ করা যায়। পাকিস্তানে সোনার প্রলেপ দেওয়া বিয়ের গয়না সেটের দাম ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার রুপি। একই ডিজাইনের আসল সোনার সেটের দাম লাখ লাখ রুপি, এমনকি ১০ লাখের বেশি হতে পারে।

বদলে যাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি

শ্রীনগরের সোনা ব্যবসায়ী নিসার আহমদ ভাট বলেন, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। অনেকে এখন সোনাকে অলংকার নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।

নিসার বলেন, ‘মানুষ সোনা পরার আনন্দ চায়, কিন্তু সাধ্যের মধ্যে; সোনা সব সময় সোনাই থাকবে। তবে মানুষ এটিকে হয়তো এখন মূলত বিনিয়োগ হিসেবেই দেখবে, দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস হিসেবে নয়।’

বাস্তবতা হলো, বিশ্বে সোনাই সবচেয়ে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। বলা হয়, একমাত্র সোনার দরেই সাধারণত বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা যায় না। সোনা কিনে রাখলে লোকসানের ভয় নেই বলা যায়। এ কারণেই সোনার প্রতি সবার এত আকর্ষণ। ৫০ বছর আগে কেউ সোনা কিনে রাখলেও তা ভালো বিনিয়োগ হিসেবেই বিবেচিত। শেয়ারবাজার, ডলার বা অন্য কিছু—এই নিশ্চয়তা দেয় না।

উচ্চ মূল্যের কারণে সোনার প্রতি মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও জোরালো হবে। অর্থাৎ সোনা আর দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস নয়; বরং আরও বেশি করে বিনিয়োগমাধ্যম বা সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হবে।

Read full story at source