বাংলাদেশের ইতিহাসে তীব্র মাত্রার যত ভূমিকম্প

· Prothom Alo

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি বড় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত—ডাউকি ফল্ট, সুনামগঞ্জ–শিলং প্ল্যাটফর্ম এবং আরাকান ট্রেঞ্চ। ফলে এই ভূখণ্ডে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়া ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; বরং অতীতের বাস্তবতারই পুনরাবৃত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের কয়েক শ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে বেশ কিছু বিধ্বংসী ভূমিকম্প আঘাত এনেছে। কোথাও নদীর গতিপথ বদলে গেছে, কোথাও গ্রাম-শহর ডুবে গেছে পানিতে, কোথাও ভেঙে পড়েছে দুর্গ, মসজিদ ও প্রাচীন স্থাপত্য। সাম্প্রতিক সময়েও এ রকম কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে গত ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প পুরো দেশের মানুষকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

Visit casino-promo.biz for more information.

ইতিহাসের পাতায় থাকা বড় বড় কিছু ভূমিকম্পের গল্প থাকল এখানে।

১৫৪৮: প্রথম বড় ভূমিকম্পের দলিল

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে লিপিবদ্ধ প্রথম বড় ভূমিকম্পটি সংঘটিত হয় ১৫৪৮ সালে। তখনকার তথ্যে উল্লেখ—চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বহু স্থানে মাটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে ফেটে যায়, বেরিয়ে আসে দুর্গন্ধযুক্ত কাদা ও গ্যাসের বুদ্‌বুদ। যদিও প্রাণহানির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক আচরণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে।

বারবার কেন ভূমিকম্প হচ্ছে

১৬৪২: সিলেটের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত

এক শতাব্দী পর সিলেটে ঘটে আরেকবার প্রবল ভূকম্পন। দালান-কোঠা ভেঙে পড়ে, বাজারঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগের মতোই প্রাণহানির সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না—কিন্তু এ ঘটনা ভূমিকম্পপ্রবণতার আরেকটি প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে রয়ে যায়।

১৭৬২: আরাকান ভূমিকম্প—চট্টগ্রাম ও ঢাকার ভয়াবহ ধ্বংস

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ভূমিকম্পগুলোর একটি—১৭৬২ সালের এপ্রিলের সেই ঘটনা। চট্টগ্রামে মাটি ফেটে উঠেছিল কাদা-পানি, কোথাও পুরো গ্রাম দেবে গিয়ে সমুদ্রগর্ভে বিলীন। ‘বাকর চনক’ নামের এক জনপদে প্রায় ২০০ মানুষ তাদের গবাদিপশুসহ পানির নিচে নিমজ্জিত হয় বলে উল্লেখ আছে ঐতিহাসিক নথিতে।

ঢাকার নদী-ঝিলে প্রবল ঢেউ দেখা যায়, পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে পরে নেমে এলে নদীর পাড়ে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য মৃত মাছ। বহু বাড়িঘর ভেঙে পড়ে; নিহত হয় প্রায় ৫০০ মানুষ। ভূ-অভ্যন্তর থেকে শোনা যায় গর্জনধ্বনি—যা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়।

১৭৭৫ ও ১৮১২: শক্তিশালী কম্পন, সীমিত তথ্য

ঢাকা ও সিলেট অঞ্চলে এই দুবার বড় কম্পন অনুভূত হয়। কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণহানি কম হওয়ায় ঘটনাগুলো নিয়ে তেমন বিশদ নথি তৈরি হয়নি। তবু এগুলো ভবিষ্যতের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিয়ে গেছে।

পিঁপড়া কি ভূমিকম্প আগেই টের পায়, গবেষণা যা বলছে

১৭৮৭: ডাউকি ভূমিকম্প—বদলে যায় ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ

এই ভূমিকম্প ছিল ভূপ্রকৃতিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আগে ব্রহ্মপুত্র নদ ময়মনসিংহ হয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু এই ভূমিকম্পের পর নদী ধীরে ধীরে সরে আসে পশ্চিম দিকে—গঠিত হয় বর্তমান যমুনা নদীর প্রবাহপথ।

গবেষকদের মতে, প্রায় ১০০০–১২০০ বছর আগে সংঘটিত আরেকটি বিশাল ভূমিকম্প মেঘনা নদীকেও ২০–৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরিয়ে দেয়। মানে নদীর পথ বদলানোও ভূমিকম্পের প্রভাব।

প্রকৃতির এই পরিবর্তন প্রমাণ করে—ভূমিকম্প কেবল স্থাপনা ভাঙে না, পুরো ভূগোলকে পুনর্লিখন করে।

১৮৬৫: সীতাকুণ্ডের পাহাড় ফেটে ওঠে কাদা–বালি

সীতাকুণ্ডের এক পাহাড় চিড় ধরে নিচ থেকে বালিমাটি বেরিয়ে আসে। যান্ত্রিক স্থাপনার ক্ষতি কম হলেও ভূগর্ভস্থ চাপে যে অনিশ্চয়তা লুকানো আছে—এটা সেই সময়ে আবার বোঝা যায়।

১৮৮৫: ‘বেঙ্গল আর্থকোয়েক’—সাটুরিয়া কেন্দ্র

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার কোদালিয়া ছিল ভূমিকম্পটির সম্ভাব্য উপকেন্দ্র। মাত্রা ছিল প্রায় ৭। ঢাকার বহু স্থাপনা ফাটল ধরে, ময়মনসিংহ, শেরপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। ভারতের বিহার, সিকিম, মণিপুর ও মিয়ানমারেও কম্পন অনুভূত হয়। চোখের দেখায় ধ্বংস স্পষ্ট হলেও ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব ইতিহাসে অনুপস্থিত।

১৮৯৭: ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’

১২ জুন, ১৮৯৭—দক্ষিণ এশিয়ার ভূমিকম্প ইতিহাসের ভয়াবহ দিন। রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল প্রায় ৮। চট্টগ্রাম ও ঢাকার বহু স্থাপনা, রেল–সড়ক যোগাযোগ, প্রশাসনিক ভবন ভেঙে পড়ে। সিলেটে নিহত হয় ৫৪৫ জনের বেশি। আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫০ লাখ টাকার সমপরিমাণ।

এ ভূমিকম্পের সময় চট্টগ্রামে ঝাঁকুনি স্থায়ী ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা বালি–কাদা কূপ, খাদ আর খালের প্রবাহ পরিবর্তন করে দেয়।

৩ থেকে ৩ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিদিন কতবার ঘটে, জানলে অবাক হবেন

১৯১৮: শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প

মাত্রা ছিল ৭.৬। শ্রীমঙ্গলে বহু ভবন ধসে পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়। ভূগর্ভস্থ চাপের নাটকীয় মুক্তি সেই সময়ে আবারও সতর্ক করেছিল বিশেষজ্ঞদের।

১৯৫০: আসাম ভূমিকম্প—বাংলাদেশে অনুভূত

মাত্রা ৮.৭—বিংশ শতকের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প। বাংলাদেশের অনেক জায়গায় কেঁপে উঠলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। তবে সিলেটসহ সীমান্ত অঞ্চলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৯৭: চট্টগ্রাম ভূমিকম্প

২২ নভেম্বর ঘটে প্রায় ৬ মাত্রার ভূমিকম্প। শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল ধরে, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।

১৯৯৯: মহেশখালী—মধ্যম মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি

৫.২ মাত্রার কম্পনে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় এটিই ছিল দেশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পঘটিত ক্ষতি।

টেইলর সুইফটের কনসার্টের কারণে কি সত্যিই ভূমিকম্প হয়

Read full story at source