প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারের পথে অন্তরায় কী
· Prothom Alo

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিগত সময়ে তথাকথিত নানা সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। কখনো নতুন কারিকুলাম, কখনো মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তন, আবার কখনো আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণের চেষ্টা—সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিকতা তৈরি না হয়ে বরং একটি বিচ্ছিন্ন, পরীক্ষামূলক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে।
নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই উন্নত দেশের উদাহরণ টেনে এনে দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় বিভিন্ন মডেল গ্রহণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষা কোনো ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ব্যবস্থা নয়, এটি গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িত।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
আমরা চাইলেই উন্নত দেশের একটা ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া দেশে চাপিয়ে দিয়ে তার সাফল্য কামনা করতে পারি না। কেননা তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সেই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অভাব ও গবেষণাভিত্তিক নীতি তৈরির প্রতি অনীহা।
ফলে আমরা অবশ্যম্ভাবীভাবে দেখি যে এমন চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থাগুলো বাংলাদেশে অকার্যকর হয়েছে, যদিও সেটাই হওয়ার কথা, তখন জাতীয় শিক্ষাক্রমের প্রতি আস্থা ক্রমেই কমতে থাকে, যা আমরা বিগত সময়ে দেখেছি।
আর সে কারণেই আমরা দেখতে পাই যে সামর্থ্যবান অভিভাবকদের একটি বড় অংশ এখন বিকল্প হিসেবে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন। এটি কেবল একটি পছন্দের পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। যখন নাগরিকেরা নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রের মূলধারার শিক্ষা থেকে সরে আসতে শুরু করেন, তখন সেটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত করে।
আমাদের করণীয় হবে পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা নীতি সংস্কারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া। আর সেটি শুরু হতে পারে একটি পৃথক ও সার্বভৌম শিক্ষা কমিশন গঠন করার মাধ্যমে
এ পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? এর একটি প্রধান কারণ হলো নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। শিক্ষানীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক সময়সূচি ও তাৎক্ষণিক সাফল্যের চাপে দ্রুত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হওয়া। ফলে একটি কারিকুলাম ঠিকমতো বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই আরেকটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কোনো একটি পরিকল্পনা যদি দেশের জন্য ভালো হয়, তাকে চলমান রাখার ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে।
একটি নীতিমালা কেবল বিগত সরকারের আমলে হয়েছে বলেই তাকে বাতিল করতে হবে, সেই ধ্যানধারণা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। ইতিবাচক পরিকল্পনার রাজনীতিকরণ হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার অন্যতম একটি কারণ।
এ থেকে সরে না আসতে পারলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেই পুরোনো ফাঁদের চক্করেই থেকে যেতে পারে। যে প্রবণতা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে লটারি ব্যবস্থার বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে। যা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ যেমন বাড়াবে, তেমনি ভর্তি ও কোচিং–বাণিজ্যও বৃদ্ধি করবে, যা কাম্য নয়।
বিশ্বের কয়েকটি উন্নত দেশ, বিশেষ করে ফিনল্যান্ড ও চীনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে তাদের শিক্ষা সংস্কার রাতারাতি হয়নি; বরং কয়েক দশক ধরে একটি সুসংহত, গবেষণাভিত্তিক এবং শিক্ষককেন্দ্রিক নীতির মাধ্যমে তা গড়ে উঠেছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে রূপান্তর করেছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা যেভাবে সংস্কার করা দরকারএই তিনটি দেশই তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি অধিক জোর দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা, যার মাধ্যমে নতুন ধরনের উচ্চমানের উৎপাদনশীল শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থাকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা। এখানে বিশেষভাবে চীনের কথা আমরা বলতে পারি, যেখানে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি তাদের জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে শুধু দক্ষ মানবসম্পদই তৈরি করেনি; বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
যে কারণে আধুনিক প্রযুক্তির উদাহরণের কথা এলে এখন চীনের কথাই সর্বাগ্রে চলে আসে। এই উদাহরণগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে সফলতা আসে ধারাবাহিকতা, একটি দেশের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একেবারেই অনুপস্থিত।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, আমরা শুরু করব কোথা থেকে? একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বলতে পারি যে সংস্কারের সূচনা হতে হবে প্রাথমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে। সরকারের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; বরং আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের সংস্কারের উদ্যোগ এখনই শুরু করতে হবে। কেননা প্রাথমিক শিক্ষাই হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর পুরো শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। যদি প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে শিক্ষার উচ্চস্তরের সংস্কার টেকসই হবে না।
প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের লড়াই। হরিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ, জুড়ী, মৌলভীবাজার, ৮ এপ্রিলপ্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তকের মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ করে তোলা। একই সঙ্গে মূল্যায়নপদ্ধতিতেও এমন পরিবর্তন প্রয়োজন, যা মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে সমালোচনামূলক চিন্তা বা ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিংকে উৎসাহিত করে।
এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং মানোন্নয়নে জোর দেওয়া। শিক্ষকদের দক্ষতার উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করা। কেননা বাংলাদেশের প্রান্তিক এলাকায় আমরা এমনও প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখি যে শিক্ষকদের দক্ষতার সঙ্গে শহুরে শিক্ষকদের দক্ষতার একটি বড় পার্থক্য দৃশ্যমান। যদিও আমরা জানি যে প্রাথমিক শিক্ষকদের দক্ষতার উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় পরিসরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করে আসছে কিন্তু এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
যা আমাদের দ্বিতীয় বিষয়টির দিকে নিয়ে আসে, সেটি হলো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলামের পুনর্মূল্যায়ন করা। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি যে যখন কারিকুলামে প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় যুক্ত করা হলো, তখন আমরা গ্রাম ও শহরের বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য দেখতে পেলাম। কেননা আমাদের গ্রামের বিদ্যালয়গুলোতে শহরের মতো প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারিনি।
তৃতীয়ত, গ্রাম ও শহরের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য কমাতে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশেষ নজর দিতে হবে। এখানে দুটো বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমটি হলো শহর এলাকার বাইরের বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সুবিধার সমবণ্টন নিশ্চিত করা।
মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি এত অবহেলা কেনগবেষণার জন্য গ্রামগঞ্জ ঘুরে ঘুরে আমি দেখতে পেয়েছি, এমনও বিদ্যালয় আছে, যেখানে তাদের ঘরগুলোতে টিনের চালও ঠিকমতো নেই। তেমন বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা প্রদান ও গ্রহণ রীতিমতো একটি চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের উদাহরণ আমাদের দেশের চরাঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে খুঁজে বের করা খুব একটা দুরূহ কাজ নয়।
চতুর্থ বিষয় হলো, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা, অর্থাৎ বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়টির দিকে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ হাতে নেওয়া প্রয়োজন। কেননা আমরা দেখি, বেশির ভাগ সময়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কম হওয়ার কারণে সংসার চালানোর জন্যই পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের যুক্ত থাকতে হয়।
ফলে স্বভাবতই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হলে এ ব্যবস্থার যাঁরা প্রধান কারিগর, তাঁদের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার দিকে সরকারের যথাযথ মনোযোগ রাখা জরুরি। এতে করে শিক্ষকেরা নিয়মিতভাবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে নিয়োজিত থাকতে পারবেন।
এখন আমাদের করণীয় হবে পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা নীতি সংস্কারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া। আর সেটি শুরু হতে পারে একটি পৃথক ও সার্বভৌম শিক্ষা কমিশন গঠন করার মাধ্যমে।
বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব