পশ্চিমবঙ্গে হুমায়ুন-ওয়াইসির মুসলিম জোটের ভাঙনে কতটা স্বস্তিতে তৃণমূল
· Prothom Alo

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় দুই উদ্বেগের একটা গতকাল শুক্রবার কেটে গেল। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার নেতা হুমায়ুন কবির। একদিকে তিনি নতুন দল গঠন করেছিলেন, অন্যদিকে জোট বেঁধেছিলেন জাতীয় স্তরে মুসলিম সমাজের জনপ্রিয় নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সঙ্গে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা যৌথভাবে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের ১৮২টিতে প্রার্থী দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
Visit fish-roadgame.online for more information.
ধারণা করা হচ্ছিল, মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছুটা ভোট টেনে নিয়ে এই জোট তৃণমূলের বিপদ বাড়াবে। ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে প্রায় ৯১ লাখ ভোটার বাদ যাওয়ার পর যথেষ্ট উদ্বেগেই রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সে অবস্থায় মুসলিম ভোট ভাগ হলে তাদের বিপদ আরও বাড়ত।
তবে এখন সেই আশঙ্কা অনেকটাই কমে গেল গতকাল এআইএমআইএমের ঘোষণার পর। তারা বিবৃতি দিয়ে বলেছে, এই নির্বাচনে হুমায়ুন কবিরের দল ‘আমজনতা উন্নয়ন পার্টি’র সঙ্গে তারা জোট বাঁধছে না।
সম্প্রতি একটি ভিডিও সামনে এসেছে। অবশ্য এর সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করা যায়নি। যেখানে হুমায়ুন কবিরকে (বা তাঁর মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে) বলতে শোনা যাচ্ছে, বিজেপির কাছ থেকে তিনি হাজার কোটি টাকা দাবি করেছেন, যাতে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজকে ‘বিভ্রান্ত’ করা যায়।
এই ভিডিও সামনে আসার পর গতকাল এআইএমআইএম বিবৃতিতে বলেছে, ‘মুসলিমদের সততা বা অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়—এমন কোনো বক্তব্যের সঙ্গে এআইএমআইএম নিজেদের জড়াবে না। আজ (শুক্রবার) থেকে কবিরের দলের সঙ্গে এআইএমআইএম তাদের জোট প্রত্যাহার করছে। বাংলার মুসলিমরা অন্যতম দরিদ্র, অবহেলিত ও শোষিত একটি সম্প্রদায়। কয়েক দশকের ধর্মনিরপেক্ষ শাসন সত্ত্বেও তাদের জন্য কিছুই করা হয়নি। আমরা আসন্ন বাংলা নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে লড়ব এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনো দলের সঙ্গে কোনো জোটে যাব না।’
তবে স্বতন্ত্রভাবে লড়াইয়ের জন্য যে সময় দরকার, তা এআইএমআইএমের হাতে আর নেই। তাহলে তাদের পক্ষে এই নির্বাচনেও আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। গত বিধানসভায়, অর্থাৎ ২০২১ সালেও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে লড়ার চেষ্টা করেছিল এআইএমআইএম। কিন্তু পারেনি। কারণ, সেভাবে তারা সাড়া পায়নি। পাশাপাশি ২০২১ সালে একাধিক জাতীয় স্তরের মুসলিম সংগঠন পশ্চিমবঙ্গে প্রার্থী দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম ভোট না কাটার পরামর্শ দিয়েছিল।
বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া
বিজেপি অবশ্য জানিয়েছে, হুমায়ুন কবিরের দলকে সাহায্য করার মতো কোনো পদক্ষেপ তারা পশ্চিমবঙ্গে কোনো সময়ই নেয়নি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, ‘হুমায়ুন ও বিজেপি হলো উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মতো, যারা কখনোই এক হতে পারে না। আমরা বিরোধী বেঞ্চে আরও ২০ বছর বসব, কিন্তু এমন কারও সঙ্গে সম্পর্ক করব না, যিনি পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ বানাতে চান।’
তবে অমিত শাহ এ ক্ষেত্রে হুমায়ুনের ভিডিওতে প্রচারিত তথাকথিত বক্তব্যের বিরোধিতা করলেও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে লড়েছিলেন হুমায়ুন কবির। কিছুদিন আগে হুমায়ুন পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে।
অন্যদিকে তৃণমূলের প্রকাশিত ১৯ মিনিটের এই ভিডিওকে হুমায়ুন ‘এআই জেনারেটেড’ বা কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ও প্রচারিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল মুসলিম সমর্থন হারানোর ভয়ে তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তিনি এ বিষয়ে আদালতে যাবেন।
অমিত শাহর মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তিনি ২০ বছর বিরোধী বেঞ্চে বসার কথা বলেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে মানুষের মন কীভাবে কাজ করছে, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের অবস্থা
তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর গতবারের বিধানসভা (২০২১) নির্বাচনে একটি মুসলিমপ্রধান দল গঠিত হয়। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ। গত পাঁচ বছরে তারা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিরাট ছাপ ফেলতে না পারলেও মুসলিম সমাজের সামনে বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। এবারও তারা নির্বাচনে লড়ছে, যা দক্ষিণবঙ্গের কিছু অংশে তৃণমূলের মুসলিম ভোট কাটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মুসলিম সমাজের ভোট তৃণমূলের জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলেও এই সমাজের বড় অংশ মনে করছে, তাদের যতটা সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য ছিল বা তাদের ইস্যুগুলোকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে তৃণমূলের দেখা উচিত ছিল, তা তারা দেখেনি।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম সেলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুসলিম সমাজের ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়ে যে আইন করা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন। এ ছাড়া অনগ্রসর শ্রেণির জন্য যে কোটাব্যবস্থা আছে, সেটিকে নতুন করে এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে, যাতে মুসলিম সমাজ এর সুবিধা অতীতের মতো না পায়।’
ওই নেতা বলেন, ‘পাশাপাশি মুসলিম অঞ্চল ধরে ধরে মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসবের প্রতিবাদ যেভাবে তৃণমূল করলে মুসলিম সমাজ খুশি হতো, তারা তা সেভাবে করেনি। এটা নিয়ে আমাদের সমাজের মধ্যে একটা ক্ষোভ রয়েছে।’
ওই নেতা আরও বলেন, এ অবস্থায় একসময় তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত মুর্শিদাবাদের জনপ্রিয় নেতা হুমায়ুন কবির বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসছিলেন। মুসলিম সমাজের সঙ্গে এসব বৈষম্য নিয়ে তিনি সমাজের ভেতর থেকে বলছিলেন। এটা তৃণমূল কংগ্রেসকে উদ্বেগে ফেলে দিয়েছিল।
এ ছাড়া মুসলিম সমাজের সঙ্গে আরও অনেক বঞ্চনা পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে। তা নিয়ে বিস্তারে লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে সমাবেশে বক্তৃতা করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ১০ এপ্রিল ২০২৬, উত্তর চব্বিশ পরগনাপশ্চিমবঙ্গে প্রতিনিধিত্বহীন হচ্ছে মুসলিম সমাজ: প্রতিবেদন
যেমন সদ্য গঠিত একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’–এর এক প্রতিবেদন বলছে, সপ্তদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় (২০২১-২৬) মুসলমান জনপ্রতিনিধি ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা অন্তত ২৭ শতাংশ। তৃণমূল কংগ্রেস যখন প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল, অর্থাৎ ২০১১ সালে মুসলিম জনপ্রতিনিধির হার ছিল ২০ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর অর্থ, বিধানসভায় ক্রমাগত মুসলিম জনপ্রতিনিধিত্বের হার কমছে।
‘সবর ইনস্টিটিউট’–এর ওই প্রতিবেদন বলছে, রাজ্যের ২৫৬টি প্রশাসনিক কমিটির আসন আছে। এই ২৫৬ আসনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জন মুসলিম আছেন, যা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যদিও জনসংখ্যার হারের হিসাবে ২৭ শতাংশ মুসলিম সমাজের প্রাপ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যান্য বৃহৎ জনগোষ্ঠী, যেমন তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক গোষ্ঠীতে তাদের প্রতিনিধিত্ব অনেক বেশি। বিধানসভায়ও তফসিলি জাতীয় উপজাতিদের প্রতিনিধিত্ব মুসলিম সমাজের চেয়ে অনেক বেশি।
তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম সেলের ওই নেতার বক্তব্য, জাতীয় উপজাতিদের ভোটের বড় অংশই তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে গেলেও তাদের জন্য বেশি জায়গা বা বেশি আসন বিধানসভা বা প্রশাসনিক কমিটিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে মুসলিমদের। এই ক্ষোভের জেরে এবার মানুষ অন্য মুসলিম দল বা কংগ্রেস ও বামপন্থীদের হয়তো ভোট দিতে পারেন।
কংগ্রেস ও বামপন্থীদের ভোট কাটার ভয় এখনো কিছুটা থাকলেও হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন মুসলিম জোটের ভয় গতকাল থেকে অনেকটাই কেটে গেছে। এটাকে একটা বড় স্বস্তি বলে মনে করছে তৃণমূল কংগ্রেস।
ভবানীপুরে ৫০ হাজার ভোটার বাদ, কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা