টোকিওকে বাঁচায় বিশাল এক ব্যাঙ
· Prothom Alo

জাপানের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির আফটার দ্য কোয়েক—১৯৯৫ সালের হানশিন ভূমিকম্পের ছায়ায় লেখা ছয়টি গল্পের সংকলন। আফটার দ্য কোয়েক বইয়ের পঞ্চম গল্প ‘সুপার-ফ্রগ সেইভস টোকিও’-এর বাংলা রূপ ‘টোকিওকে বাঁচায় বিশাল এক ব্যাঙ’।
• ভাষান্তর: জিয়া হাশান
Visit esporist.com for more information.
‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের প্রথম গল্প
‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের দ্বিতীয় গল্প
‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের তৃতীয় গল্প
‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের চতুর্থ গল্প
কাতাগিরি তার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দেখে—একটা বিশাল ব্যাঙ তার জন্য অপেক্ষা করছে। পেছনের দুই পায়ে দাঁড়ানো সে ব্যাঙ ছয় ফুটের বেশি লম্বা, শক্তপোক্ত তার শরীর। কাতাগিরি রোগাপাতলা ধরনের পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির মতো এক মানুষ। তাই তার কাছে ব্যাঙটার বিশাল আকার ভীষণ ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
‘আমাকে “ব্যাঙ” বলে ডাকবেন,’ স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে বলে ব্যাঙটা।
তার কথা শুনে কাতাগিরি দরজার মুখে থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এমনকি কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
‘ভয় পাবেন না, আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। ভেতরে এসে দয়া করে দরজাটা বন্ধ করে দিন।’
ডান হাতে ব্রিফকেস, আর বাঁ হাতে টাটকা সবজি ও স্যামন মাছের টিনের কৌটাবোঝাই বাজারের ব্যাগ জড়িয়ে ধরে কাতাগিরি নড়তে সাহস পায় না।
‘কাতাগিরি সাহেব, দয়া করে তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করুন, আর জুতোজোড়া খুলে ফেলুন।’
নিজের নাম শুনে কাতাগিরি যেন সংবিৎ ফিরে পায়। নির্দেশমতো সে দরজা বন্ধ করে, উঁচু কাঠের মেঝেতে বাজারের ব্যাগটা রাখে। তারপর ব্রিফকেসটা এক বগলের নিচে চেপে ধরে জুতার ফিতা খুলে ফেলে। বিশাল ব্যাঙ তখন কাতাগিরিকে রান্নাঘরের টেবিলে বসতে ইশারা করে। সে তাই সেখানেই গিয়ে বসে পড়ে।
‘আমি দুঃখিত, মিস্টার কাতাগিরি’ ব্যাঙ বলে, ‘আপনি বাইরে থাকার সময় আপনার বাসায় ঢুকে পড়ার জন্য। জানতাম, এখানে আমাকে দেখে আপনি চমকে উঠবেন। কিন্তু আমার আর অন্য কোনো উপায় ছিল না। এক কাপ চা হলে কেমন হয়? আপনি শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন, তাই আগে থেকেই আমি পানি ফুটিয়ে রেখেছি।’
কাতাগিরি তখনো তার ব্রিফকেসটা বগলের নিচে চেপে ধরা। সে মনে মনে ভাবে, কেউ নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে। কেউ একটা বিশাল ব্যাঙের পোশাক পরে আমার সঙ্গে মজা নিচ্ছে। কিন্তু ব্যাঙ যখন গুনগুন করতে করতে ফুটন্ত পানি কেটলি থেকে কাপে ঢালে, তখন তা দেখেই কাতাগিরি বুঝে যায় যে এগুলো কোনো পোশাক পরা মানুষের চালচলন নয়; এগুলো সত্যিকারের ব্যাঙের হাত-পা আর তাদের নড়াচড়া।
ব্যাঙ এক কাপ গ্রিন-টি কাতাগিরির সামনে এনে রাখে, আর নিজের জন্য আরেক কাপ তৈরি করে নেয়।
চুমুক দিতে দিতে ব্যাঙ জিজ্ঞেস করে ‘এবার একটু শান্তি লাগছে না?’ কিন্তু কাতাগিরির মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হয় না।
‘আমি যদি সিগারেট খাই তাহলে কি তোমার কোনো আপত্তি আছে?’ ‘একদমই না, একদমই না,’ হাসিমুখে বিশাল ব্যাঙ বলে। ‘এটা আপনার বাসা। আমার অনুমতি নেওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি নিজে ধূমপায়ী নই, কিন্তু অন্যের বাসায় ধূমপানের প্রতি আমার অনীহা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার আমার নেই।’
‘আমি জানি, মিস্টার কাতাগিরি, আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসার আগে আমার ঠিকঠাকমতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া উচিত ছিল। সামাজিক শিষ্টাচারের ব্যাপারে আমি পুরোপুরি সচেতন। যে কেউই চমকে উঠবে, যদি বাসায় ফিরে দেখে তার জন্য এক বিশাল ব্যাঙ অপেক্ষা করছে। কিন্তু একান্ত জরুরি একটা ব্যাপারে আমি এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি। প্লিজ, আমাকে মাফ করে দেবেন।’
‘জরুরি ব্যাপার? সেটা আবার কী?’ শেষ পর্যন্ত কথাটা কোনোভাবে মুখ থেকে বের করতে পারে কাতাগিরি।
‘অবশ্যই জরুরি’ ব্যাঙ বলে। ‘তা না হলে আমি কেনই–বা কারও বাসায় এভাবে অনধিকার প্রবেশ করব? এই ধরনের অশোভন আচরণ আমার স্বভাবে নেই।’
‘আপনার “জরুরি ব্যাপাটার”টার সঙ্গে কি আমার কোনো সম্পর্ক আছে?’
‘আছে এবং নেই,’ মাথা একটু কাত করে ব্যাঙ বলে। ‘নেই আবার আছে।’
নিজেকে সামলাতে হবে, মনে মনে ভেবে নেয় কাতাগিরি। তারপর বলে ‘আমি যদি সিগারেট খাই তাহলে কি তোমার কোনো আপত্তি আছে?’
‘একদমই না, একদমই না,’ হাসিমুখে বিশাল ব্যাঙ বলে। ‘এটা আপনার বাসা। আমার অনুমতি নেওয়ার কোনো দরকার নেই। ইচ্ছেমতো ধূমপান করুন, খাওয়াদাওয়া করুন। আমি নিজে ধূমপায়ী নই, কিন্তু অন্যের বাসায় ধূমপানের প্রতি আমার অনীহা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার আমার নেই।’
কাতাগিরি তার কোটের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালায়। আগুন ধরাতে গিয়ে সে দেখে, তার হাত কাঁপছে। আর তার প্রতিটা নড়াচড়া ঠিক মুখোমুখি বসা বিশাল ব্যাঙ যেন মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছে।
‘তুমি কোনোভাবে কোনো গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত নও তো?’ সাহস করে কাতাগিরি প্রশ্ন করে।
‘হা হা হা হা হা হা! কী চমৎকার রসবোধ আপনার, মিস্টার কাতাগিরি!’ ঊরুর ওপর নিজের হাত চাপড়াতে চাপড়াতে বিশাল ব্যাঙ বলে। ‘দেশে দক্ষ শ্রমিকের অভাব থাকতে পারে বটে, কিন্তু তাই বলে কোন গ্যাংই–বা তাদের নোংরা কাজ করানোর জন্য একটা ব্যাঙকে ভাড়া করবে? করলে তো তারা হাসির পাত্র হয়ে উঠবে।’
‘আচ্ছা, তুমি যদি এখানে কোনো ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে দর–কষাকষি করতে এসে থাকো, তবে তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। সেটা কেবল আমার সিনিয়র অফিসাররাই নিতে পারেন। আমি শুধু নির্দেশ পালন করি। তোমার জন্য আমি কিছুই করতে পারব না।’
‘প্লিজ, মিস্টার কাতাগিরি,’ একটা আঙুল তুলে ব্যাঙ বলে। ‘আমি এত তুচ্ছ কোনো কাজের জন্য এখানে আসিনি। আমি ভালো করেই জানি, আপনি টোকিও সিকিউরিটি ট্রাস্ট ব্যাংকের শিনজুকু শাখার ঋণ বিভাগের একজন অফিসার। কিন্তু আমার এখানে আসার সঙ্গে ঋণ পরিশোধের বিষয়-আশয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এখানে এসেছি টোকিওকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।’
কোথাও লুকানো কোনো টিভি ক্যামেরা আছে কি না, তা পরখ করে নেওয়ার জন্য কাতাগিরি রুমের চারদিকে জুড়ে চোখ বুলিয়ে নেয়। এটা যদি তাকে নিয়ে বড় ধরনের কোনো রসিকতা হয়ে থাকে তাহলে সে ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু না, কোথাও কোনো ক্যামেরা নেই। বাসাটা ছোটখোটো। তাই এতে কারও লুকিয়ে থাকার মতো জায়গাও নেই।
‘না, এখানে আর কেউ নেই’ বিশাল ব্যাঙ বলে, ‘এখানে আমরা এ দুজনই আছি। আমি জানি, আপনি ভাবছেন নিশ্চয়ই আমি পাগল, অথবা আপনি কোনো স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু আমি পাগল নই, আর আপনি স্বপ্নও দেখছেন না। বিষয়টা একেবারেই, নিঃসন্দেহে, অত্যন্ত গুরুতর।’
‘সত্যি বলতে কি, মিস্টার ব্যাঙ—’
‘প্লিজ, আমাকে কেবল “ব্যাঙ” বলেই ডাকুন।’ এবার একটা আঙুল তুলে সে বলে।
‘সত্যি বলতে কি’ কাতাগিরি বলে, ‘এখানে আসলে কী হচ্ছে, তা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তোমার ওপর আমার অবিশ্বাস নেই, কিন্তু পরিস্থিতিটা যেন পুরোপুরি ধরতে পারছি না। তোমাকে দু-একটা প্রশ্ন করলে কি কোনো আপত্তি আছে?’
‘আমি এত তুচ্ছ কোনো কাজের জন্য এখানে আসিনি। আমি ভালো করেই জানি, আপনি টোকিও সিকিউরিটি ট্রাস্ট ব্যাংকের শিনজুকু শাখার ঋণ বিভাগের একজন অফিসার। কিন্তু আমার এখানে আসার সঙ্গে ঋণ পরিশোধের বিষয়-আশয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এখানে এসেছি টোকিওকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।’
‘একদমই না, একদমই না,’ বিশাল ব্যাঙ বলে। ‘নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নেওয়া খুবই জরুরি। কেউ কেউ অবশ্য বলে, ‘বোঝাপড়া’ আসলে আমাদের সব ভুল–বোঝাবুঝিরই সমষ্টি—এই মতটাকে আমি নিজের মতো করে বেশ আকর্ষণীয় মনে করি বটে, কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন এখানে যে মনোরম পরিবেশ বিরাজ করছে, তা থেকে সময় নষ্ট করার অবকাশ আমাদের নেই। তাই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে, একেবারে সংক্ষিপ্ত পথে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নেওয়া। তাই নির্দ্বিধায় যত খুশি প্রশ্ন করুন।’
‘তাহলে, তুমি কি সত্যিই একটা ব্যাঙ, তা ঠিক তো?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই, আপনি যেমনটা দেখছেন। আমি একেবারেই সত্যিকারের ব্যাঙ। কোনো রূপক, ইঙ্গিত, বিনির্মাণ নই। এ ধরনের কোনো জটিল প্রক্রিয়ার ফলে আমি তৈরি হয়নি। বরং আমি একদম খাঁটি ব্যাঙ। একবার কি ডেকে দেখাব?’
ব্যাঙ এবার মাথাটা পেছনে কাত করে আর তার বিশাল গলার পেশিগুলো শক্ত করে তোলে। তারপর গলা ছেড়ে দেয়—‘রিবিট! রি-ই-ই-বিট! রিবিট-রিবিট-রিবিট! রিবিট! রিবিট! রি-ই-ই-বিট!’ তার এ বিশাল ডাকে দেয়ালের গায়ে ঝোলানো ছবিগুলো অবধি কেঁপে ওঠে।
‘ঠিক আছে, বুঝেছি, বুঝেছি!’ কাতাগিরি বলে। তবে এ সস্তা অ্যাপার্টমেন্ট বাসাটার পাতলা দেয়ালগুলোর কথা ভেবে একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে। ‘দারুণ। নিঃসন্দেহে তুমি একজন সত্যিকারের ব্যাঙ।’
‘এমনও বলা যেতে পারে যে আমি সব ব্যাঙ নিয়ে গড়ে তোলা এক রূপ। তবু তাতে এই সত্য বদলায় না যে আমি একটা ব্যাঙ। যে কেউ যদি বলে আমি ব্যাঙ নই, সে নিরেট মিথ্যাবাদী। এমন লোককে আমি টুকরা টুকরা করে দিতে চাই!’
কাতাগিরি মাথা নাড়ে। নিজেকে শান্ত রাখার আশায় সে কাপ তুলে নিয়ে চায়ে এক চুমুক দেয়। ‘আপনি একটু আগে বলেছেন, টোকিওকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতেই আপনার এখানে আসা?’
‘হ্যাঁ, এটাই আমি বলেছি।’
‘কী ধরনের ধ্বংস?’
‘ভূমিকম্প,’ অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে ব্যাঙ বলে।
মুখ হাঁ করে কাতাগিরি এবার বিশাল ব্যাঙের দিকে তাকায়। আর ব্যাঙ কোনো কথা না বলে কাতাগিরির পানে চোখ থির করে রাখে। কিছুক্ষণ তারা এভাবেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে এবার যেহেতু তার নিজের মুখ খোলার পালা, তাই বিশাল ব্যাঙ বলে ‘একটা অত্যন্ত ভয়ংকর ভূমিকম্প আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে আটটায় টোকিওতে আঘাত হানবে। আর মাত্র তিন দিন বাকি। গত মাসে কোবেতে যে ভূমিকম্প হয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে টোকিওর ভূমিকম্প। এমনকি তাতে মৃত্যুর সংখ্যা সম্ভবত দেড় লাখ ছাড়িয়ে যাবে। তাদের বেশির ভাগই মারা যাবে সড়ক দুর্ঘটনা—ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, যানবাহন উল্টে পড়া, সংঘর্ষ, উঁচু এক্সপ্রেসওয়ে ও রেললাইনের ধসে পড়া, সাবওয়ের চাপা পড়া, তেলবাহী ট্রাকের বিস্ফোরণের কারণে। ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, বাসিন্দারা চাপা পড়বে। চারদিকে আগুন ছড়িয়ে যাবে, সড়কব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, অ্যাম্বুলেন্স ও দমকলের গাড়ি কার্যত অচল হয়ে যাবে, মানুষ অসহায়ভাবে পড়ে থাকবে। দেড় লাখ মানুষের মৃত্যুতে শহর একেবারে নরকের অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে। তখন মানুষ বুঝতে পারবে যে ঘনবসতিপূর্ণ এই ‘শহর’ নামের ব্যবস্থাটা আসলে কতটা ভঙ্গুর।’ মাথা হালকা তালে নেড়ে নেড়ে ব্যাঙ এসব কথার সঙ্গে যোগ করে ‘ভূমিকম্পের কেন্দ্র হবে শহরের শিনজুকু এলাকার অফিসপাড়া।’
‘শিনজুকু এলাকার অফিসপাড়া?’
‘আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় যে টোকিও সিকিউরিটি ট্রাস্ট ব্যাংকের শিনজুকু শাখার ঠিক নিচেই আঘাত হানবে।’
এবার ভারী নীরবতা নেমে আসে।
‘আর তুমি,’ কাতাগিরি বলে, ‘এই ভূমিকম্পটা থামানোর প্ল্যান করছ?’
‘ঠিক তাই,’ মাথা নেড়ে বিশাল ব্যাঙ বলে। ‘আমি ঠিক সেটাই করতে চাই। আপনি আর আমি টোকিও সিকিউরিটি ট্রাস্ট ব্যাংকের শিনজুকু শাখার নিচের ভূগর্ভে নেমে ভূমিকম্পের উৎস “কৃমি”-এর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করব।’
কাতাগিরি মাথা নাড়ে। নিজেকে শান্ত রাখার আশায় সে কাপ তুলে নিয়ে চায়ে এক চুমুক দেয়। ‘আপনি একটু আগে বলেছেন, টোকিওকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতেই আপনার এখানে আসা?’ ‘হ্যাঁ, এটাই আমি বলেছি।’ ‘কী ধরনের ধ্বংস?’ ‘ভূমিকম্প,’ অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে ব্যাঙ বলে।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ বিভাগের একজন অফিসার হিসেবে কাতাগিরি বহু লড়াই পাড়ি দিয়ে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর টানা ষোলো বছর ধরে তাকে প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হয়েছে। এককথায়, সে ছিল একজন ঋণ আদায়কারী। এ পদটা খুব একটা জনপ্রিয় নয়। তার বিভাগের প্রায় সবাই ঋণ দিতেই পছন্দ করে, বিশেষ করে মন্দাকালে। তখন তাদের হাতে এত টাকা এসে জমায় যে প্রায় যেকোনো জামানত—জমি কিংবা শেয়ার, তার বিপরীতে ঋণ দিতে অফিসাররা সহজেই রাজি হয়ে যায় । কারণ, যে যত বড় ঋণ দিতে পারে, কোম্পানিতে তার তত বেশি সুনাম হয়।
কিন্তু কিছু ঋণ আর কখনোই ব্যাংকে ফিরে আসে না—সেগুলো যেন ‘কড়াইয়ের তলায় আটকে যাওয়া তেলের মতো হয়ে দাঁড়ায়।’ সেগুলোর দেখভাল করাই এখন কাতাগিরির কাজ। তাই সেই অর্থনৈতিক মন্দা কেটে যাওয়ার পর এখন তার কাজের চাপ পাহাড়সম হয়ে উঠেছে। প্রথমে শেয়ারের দাম, তারপর জমির মূল্য পড়ে যাওয়ায় সব ধরনের জামানতের গুরুত্ব হারিয়ে গেছে।
তাই বসের আদেশ হয়ে দাঁড়ায় ‘বেরিয়ে পড়ো, ওদের কাছ থেকে যতটা পারো, চেপে ধরে টাকা বের করে আনো।’
শিনজুকুর কাবুকিচো এলাকা আসলে ‘এক হিংস্র জটিল গোলকধাঁধা’। এটা পুরোনো দিনের গ্যাংস্টার, কোরিয়ান মাফিয়া, চীনা মাফিয়া, বন্দুক ও মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্য। আর অন্ধকারের ভেতরের এক রহস্যময় স্থান থেকে একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে টাকা প্রবাহিত হয়। আবার মাঝেমধ্যে মানুষ ধোঁয়ার মতো উবে যায়।
খারাপ ঋণ আদায়ের কাজে কাবুকিচোতে যাওয়ায় কাতাগিরিকে মাফিয়া সদস্যরা একাধিকবার ঘিরে ধরে। হত্যা করার হুমকি দেয়। কিন্তু কাতাগিরি কখনো ভয় পায়নি।
ব্যাংকের কাজের জন্য দৌড়াদৌড়ি করা কাতাগিরিকে মারলে তাদের কী লাভ? চাইলে তারা তাকে ছুরি মারত, চাইলে মারধরও করতে পারে। তবে সে জন্য কাতাগিরি একদম এক উপযুক্ত লোকই বটে। কারণ, তার না আছে স্ত্রী-সন্তান, উভয় মা–বাবা মৃত। আর ভাই-বোনেরা কলেজ শেষ করে বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে। তাহলে যদি মাফিয়ারা কাতাগিরিকে মেরে ফেলে তাহলে কী হবে? সে নিজে চলে যাবে তবে অন্য কোনো কিছুরই কোনো অদলবদল হবে না।
কিন্তু কাতাগিরি নয়; বরং তাকে ঘিরে থাকা গুন্ডারাই তাকে এত শান্ত ও স্থির দেখে নার্ভাস হয়ে পড়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের জগতে সে এক ধরনের ‘কঠিন লোক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায়। কিন্তু এখন সেই শক্ত কাতাগিরিই পুরোপুরি অসহায়। এই ব্যাঙটা এখন আবার বলছে ‘কৃমি’।
‘কৃমিটা কে?’ কাতাগিরি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘কৃমি মাটির নিচে থাকে। সে এক বিশাল কৃমি। সে রেগে গেলে ভূমিকম্প হয়,’ ব্যাঙ বলে। ‘আর এখন সে ভীষণ, ভীষণ রেগে আছে।’
‘সে কী নিয়ে রেগে আছে?’ কাতাগিরি জিজ্ঞেস করে।
‘আমার কোনো ধারণা নেই,’ ব্যাঙ বলে। ‘তার ঘোলাটে মাথার ভেতরে কী চলছে, কেউই জানে না। খুব কম মানুষই কখনো তাকে দেখেছে। সাধারণত সে ঘুমিয়েই থাকে। আসলে এটাই তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ—লম্বা, লম্বা ঘুম। সে বছরের পর বছর—দশকের পর দশক—মাটির নিচের উষ্ণতা আর অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকে। তার চোখ, যেমনটা আপনি কল্পনা করতে পারেন, অকেজো হয়ে গেছে; ঘুমোতে ঘুমোতে তার মস্তিষ্ক যেন জেলির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব সে সম্ভবত কিছুই ভাবছে না—শুধু ওখানে পড়ে থাকে, চারপাশে যত ছোটখাটো কম্পন আর কাঁপুনি হয়, সবকিছু অনুভব করে, সেগুলো নিজের শরীরের ভেতর শুষে নেয়, জমিয়ে রাখে। আর তারপর কোনো এক ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলোর বেশির ভাগকেই সে রাগে পরিণত করে। কেন এমন হয়, আমার কোনো ধারণা নেই। আমি কখনোই এর ব্যাখ্যা দিতে পারব না।’
অলংকরণ: মাসুক হেলালব্যাঙটা চুপ হয়ে যায়। তার কথাগুলো মাথায় ঢোকানোর জন্য কাতাগিরির দিকে তাকিয়ে থেকে যেন তাকে সময় দেয়। তারপর ব্যাঙটা আবার বলতে শুরু করে, ‘তবে আমাকে ভুল বুঝবেন না। “কৃমি”র প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। আমি তাকে মন্দের প্রতিমূর্তি বলেও মনে করি না। এমন নয় যে আমি তাকে বন্ধু হিসেবে চাই—তা-ও না। আমি শুধু মনে করি, এই পৃথিবীর জন্য তার মতো কোনো সত্তার অস্তিত্ব থাকা এক অর্থে ঠিকই আছে। পৃথিবীটা যেন একটা বিশাল ওভারকোট, আর সেই কোটে নানা আকার-আকৃতির পকেট থাকা দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে “কৃমি” এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে আর উপেক্ষা করা নিরাপদ নয়। বছরের পর বছর ধরে সে নিজের ভেতরে যে নানা রকম ঘৃণা শুষে নিয়ে জমা করেছে, তাতে তার হৃদয় আর দেহ ভয়ংকর রকমের বিশাল হয়ে উঠেছে—আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়। আর পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে গত মাসের কোবে ভূমিকম্প। তা তাকে তার গভীর, সুখকর ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়েছে। নিজের গভীর ক্রোধ থেকেই তার একধরনের উপলব্ধি হয়েছে—এবার তারও সময় এসেছে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটানোর। আর সেটা সে করবে এখানেই, টোকিওতে। আমি জানি আমি কী বলছি, মিস্টার কাতাগিরি। ভূমিকম্পের সময় আর তার মাত্রা সম্পর্কে আমি আমার কয়েকজন বিশ্বস্ত পোকা-বন্ধুর কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য খবর পেয়েছি।’
ব্যাঙটা ঠাস করে মুখ বন্ধ করে এবং মনে হয় ক্লান্তিতে তার গোল চোখও দুটো বন্ধ হয়ে যায়।
‘তাহলে তুমি বলতে চাও,’ কাতাগিরি এবার বলে, ‘ভূমিকম্প থামাতে তোমাকে আর আমাকে একসঙ্গে মাটির নিচে গিয়ে কৃমির সঙ্গে লড়তে হবে।’
‘ঠিক তাই।’
কাতাগিরি তার চায়ের কাপ পানে হাত বাড়ায়, তুলে আবার নামিয়ে রাখে। ‘আমি এখনো বুঝতে পারছি না,’ সে বলে। ‘তোমার সঙ্গী হিসেবে তুমি আমাকেই কেন পছন্দ করলে?’
ব্যাঙটা সোজা কাতাগিরির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘মিস্টার কাতাগিরি, আপনার প্রতি আমার সব সময়ই গভীরতম শ্রদ্ধা রয়েছে। যেসব কাজ অন্যরা এড়িয়ে যায়, টানা ষোলো বছর ধরে আপনি নিঃশব্দে সেসব বিপজ্জনক, সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় দায়িত্বগুলো পালন করে যাচ্ছেন। আপনি সেগুলো চমৎকারভাবে সামাল দিচ্ছেন। আমি খুব ভালোভাবেই জানি, আপনার জন্য এগুলো করা কতটা কঠিন এবং আমি বিশ্বাস করি আপনার সিনিয়র কর্মকর্তা কিংবা সহকর্মীরা কেউই আপনার সাফল্যের যথার্থ মূল্যায়ন করেনি। তারা সবাই অন্ধ—পুরো দলটাই। কিন্তু আপনি, অমূল্যায়িত ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েও, একবারের জন্যও কোনো অভিযোগ করেননি।’
‘এটা শুধু আপনি আপনার জন্য করেননি। আপনার মা–বাবা মারা যাওয়ার পর আপনি একাই আপনার কিশোর ভাই ও বোনকে মানুষ করেছেন—নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সব দায়িত্ব। তাদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন, কলেজে পাঠিয়েছেন, এমনকি তাদের বিয়ের ব্যবস্থাও করেছেন। এ কাজে আপনি আপনার সময় ও আয়ের বড় একটা অংশ বিলিয়ে দিয়েছেন। আর নিজের বিয়ের সম্ভাবনাকেও হাতছাড়া করেছেন। তবু আপনার ভাই ও বোন কখনোই আপনার এই অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। বরং ঠিক উল্টো—তারা আপনাকে কোনো সম্মানই দেয়নি, আপনার স্নেহ ও মমতার প্রতি নির্মম উদাসীনতা দেখিয়েছে। আমার মতে, তাদের আচরণ সম্পূর্ণ অমানবিক। আপনার হয়ে তাদের ভালোমতো ধোলাই দিতে আমার প্রায়ই মন চায়। কিন্তু তাদের বিপরীতে আপনি—আপনার মধ্যে রাগের কোনো চিহ্নই নেই। সত্যি বলতে কি, মিস্টার কাতাগিরি, আপনি দেখতে তেমন আকর্ষণীয় নন, আর আপনার কথাবার্তায় বাকপটুতার ছোঁয়া নেই—এই কারণেই আশপাশের মানুষ প্রায়ই আপনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। কিন্তু আমি দেখতে পাই আপনি কতটা বিচক্ষণ আর সাহসী মানুষ। কোটি কোটি মানুষের এই টোকিও শহরে, আমার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করার জন্য আপনার মতো এতটা বিশ্বস্ত আর কাউকে আমি খুঁজে পাইনি।’
‘আমাকে একটা কথা বলো তো, মিস্টার ব্যাঙ—’ কাতাগিরি বলে।
‘প্লিজ,’ ব্যাঙটা আবার এক আঙুল তুলে বলে। ‘আমাকে কেবল ‘ব্যাঙ’ নামে ডাকুন।’
‘তাহলে বলো তো তুমি আমার সম্পর্কে এত কিছু জানলে কীভাবে?’ কাতাগিরি জিজ্ঞেস করে।
‘আহা, মিস্টার কাতাগিরি,’ ব্যাঙ বলে, ‘আমি তো এত বছর ধরে ব্যাঙ সেজে বসে ছিলাম না এমনি এমনি। জগতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে আমি সব সময় নজর রাখি।’
‘তবু বলো,’ কাতাগিরি বলে, ‘আমি বিশেষ ক্ষমতাধর কেউ নই, আর মাটির নিচে কী ঘটছে, সে সম্পর্কেও আমার কোনো ধারণা নেই। অন্ধকারে “কৃমি”র সঙ্গে লড়াই করার মতো পেশিশক্তিও আমার নেই। আমার চেয়ে অনেক শক্তিওয়ালা কাউকে তুমি নিশ্চয়ই খুঁজে পেতে পারো। ধরো, কোনো কারাতে জানা লোক কিংবা কোনো বাহিনীর কোনো সৈন্য।’
এ বিশেষ লড়াইটা যে ভয়াবহ হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি হয়তো সেখান থেকে জীবিত ফিরে না–ও আসতে পারি। লড়াইয়ে আমার এক-দুটো অঙ্গও ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু আমি কখনোই—পালিয়ে যেতে পারব না। নীটশে যেমন বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা হলো ভয়হীন থাকা।’
ব্যাঙ তার বড় বড় চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে ‘খোলাখুলি বললে, মিস্টার কাতাগিরি, লড়াইটা পুরোপুরি আমিই করব। কিন্তু একা আমি সেটা পারব না। এটাই আসল কথা—আমার দরকার আপনার সাহস আর ন্যায়বোধের প্রতি আপনার গভীর বিশ্বাস। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আপনি বলবেন, “চালিয়ে যাও, ব্যাঙ! দারুণ করছ! আমি জানি তুমি জিততে পারবে! তুমি ন্যায়ের পক্ষেই লড়ছ’!”
‘খোলাখুলি বললে, মিস্টার কাতাগিরি, অন্ধকারে “কৃমি”র সঙ্গে লড়াই করার ভাবনাটাই আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। বহু বছর ধরে আমি একজন শান্তিবাদী হিসেবে জীবন কাটিয়েছি—শিল্পকে ভালোবেসেছি, প্রকৃতির সঙ্গে বাস করেছি। লড়াই করা আমার পছন্দের কাজ নয়। কিন্তু আমাকে তা করতে হচ্ছে বলেই করি। আর এ বিশেষ লড়াইটা যে ভয়াবহ হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমি হয়তো সেখান থেকে জীবিত ফিরে না–ও আসতে পারি। লড়াইয়ে আমার এক-দুটো অঙ্গও ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু আমি কখনোই—পালিয়ে যেতে পারব না। নীটশে যেমন বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা হলো ভয়হীন থাকা।”’
‘মিস্টার কাতাগিরি, আপনার কাছে আমি যা চাই, তা হলো আপনার সেই সহজ, সরল সাহসটা আমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; একজন সত্যিকারের বন্ধুর মতো সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে আমাকে সমর্থন করা। আমি কী বলতে চাইছি, আপনি কি বুঝতে পারছেন?’
এই কথাগুলোর কোনোটাই কাতাগিরির কাছে পুরোপুরি অর্থবোধক বলে মনে হয় না, তবু অদ্ভুতভাবে—যতটাই অবাস্তব শোনাক না কেন—সে মনে করে, ব্যাঙ যা-ই বলছে, তা সে বিশ্বাস করতে পারে। ব্যাঙের মধ্যে এমন কিছু রয়েছে—তার মুখের অভিব্যক্তি, তার কথা বলার ভঙ্গি, যার মধ্যে একধরনের সরল সততা, যা সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে লাগে। সিকিউরিটি ট্রাস্ট ব্যাংকের সবচেয়ে কঠিন বিভাগে বছরের পর বছর কাজ করার ফলে কাতাগিরির ভেতরে এখন এসব জিনিস বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে উঠেছে। বলা যায়, এটি তার দ্বিতীয় স্বভাবই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাঙ দুহাত প্রশস্ত করে মেলে ধরে, তারপর আবার তার চামড়াওয়ালা হাত দুটো নিজের হাঁটুর ওপর একটা চাপড় দিয়ে রেখে দেয়।
‘আমি জানি, মিস্টার কাতাগিরি, আপনার জন্য এটা মেনে নেওয়া কঠিন। হঠাৎ এক বিশাল ব্যাঙ আপনার ঘরে ঢুকে পড়েছে, আর আপনাকে এসব আজগুবি কথায় বিশ্বাস করতে বলছে। আপনার প্রতিক্রিয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক। তাই আমি প্রমাণ দিতে চাই যে আমি সত্যিই অস্তিত্বশীল। বলুন তো, মিস্টার কাতাগিরি—ব্যাংক যে ঋণটা বিগ বেয়ার ট্রেডিংকে দিয়েছে, তা আদায় করতে গিয়ে আপনি বেশ বড় রকমের সমস্যায় পড়ছেন কি না?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই,’ কাতাগিরি বলে।
‘আচ্ছা, পর্দার আড়ালে তাদের হয়ে কাজ করছে বেশ কয়েকজন চাঁদাবাজ, আর তারা গ্যাংস্টারদের সঙ্গেও জড়িত। তারা কোম্পানিটাকে দেউলিয়া করে দিয়ে ঋণ থেকে বাঁচার ফন্দি আঁটছে। আপনার ব্যাংকের ঋণ কর্মকর্তা কোনো ঠিকঠাকমতো আগের রেকর্ড যাচাই-বাছাই না করেই তাদের হাতে নগদ টাকা তুলে দিয়েছে, আর বরাবরের মতো তার পরের ঝামেলা সামলানোর ভার এসে পড়েছে আপনার ওপরই, মিস্টার কাতাগিরি। কিন্তু এদের ঘায়েল করা আপনার পক্ষে সহজ হচ্ছে না—এরা মোটেও হালকা প্রতিপক্ষ নয়। আর কোনো ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ হয়তোবা তাদের পেছনে আছে। তাদের কাছে আপনাদের সাত শ মিলিয়ন ইয়েন পাওনা। আপনি ঠিক এই পরিস্থিতিটাতেই আছেন, তাই তো?’
‘একদম তাই।’
ব্যাঙ তার দুহাত মেলে ধরে। ফলে তার সবুজ চামড়া বড় ডানার মতো ছড়িয়ে পড়ে।
‘চিন্তা করবেন না, মিস্টার কাতাগিরি। সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দিন। আগামীকাল সকাল হতেই বুড়ো ব্যাঙ আপনার সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। নিশ্চিন্তে থাকুন, আর রাতে একটা ভালো ঘুম দিন।’
মুখে বড়সড় হাসি নিয়ে বিশাল ব্যাঙ উঠে দাঁড়ায়। তারপর শরীরটা শুকনো শুঁটকির মতো চ্যাপ্টা করে বন্ধ দরজার পাশের সরু ফাঁক গলে বের হয়ে যায়। কাতাগিরি এবার একা হয়ে পড়ে। রান্নাঘরের টেবিলে রাখা দুটো চায়ের কাপই একমাত্র প্রমাণ যে বিশাল ব্যাঙ কাতাগিরির বাসায় এসেছিল।
পরদিন সকাল নয়টায় কাতাগিরি অফিসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তার ডেস্কের টেলিফোনটা বেজে ওঠে।
‘তাহলে বলুন তো, গত রাতে যে বিষয়টা আমি আপনার সামনে তুলেছি, সে ব্যাপারে আপনার আস্থা কি আমি অর্জন করতে পেরেছি? আপনি কি আমার সঙ্গে “বিশাল কৃমি”–এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেবেন?’ কাতাগিরি চশমাটা খুলে মুছে নিয়ে বলে ‘সত্যি বলতে কি, ভাবনাটা আমার খুব একটা পছন্দ নয়।
‘হ্যালো, মিস্টার কাতাগিরি,’ এক পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসে। কণ্ঠটা যেমন ঠান্ডা তেমনি তাতে পেশাদারি সুর। ‘আমার নাম শিরাওকা। আমি বিগ বেয়ার ট্রেডিং কোম্পানির মামলার আইনজীবী। আজ সকালে মুলতবি থাকা ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে আমার মক্কেলের কাছ থেকে একটা ফোন পেয়েছি। তিনি বলেছেন যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব নিজেই নেবেন। এ বিষয়ে তিনি সই করা একটা মেমোরেন্ডামও আপনাকে দেবেন। তার একমাত্র অনুরোধ—তার বাড়িতে আপনি যেন আর কখনো বিশাল ব্যাঙকে না পাঠান। আবার বলছি: তিনি চান আপনি বিশাল ব্যাঙকে স্পষ্টভাবে বলে দিন, সে যেন আর কখনো তার বাড়িতে না যায়। এর মানে ঠিক কী, তা আমি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নই, কিন্তু আমার মনে হয় বিষয়টা আপনার কাছে পরিষ্কার, মিস্টার কাতাগিরি। তাই তো?’
‘একদম ঠিক, কাতাগিরি বলে।
‘আপনি নিশ্চয়ই আমার এ কথাগুলো বিশাল ব্যাঙের কাছে পৌঁছে দেবেন?’
‘অবশ্যই দেব। আপনার মক্কেল আর কখনো বিশাল ব্যাঙকে দেখবে না।’
‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আগামীকালের মধ্যেই আমি আপনার জন্য মেমোরেন্ডাম রেডি করে দেব।’
‘আমি তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব,’ কাতাগিরি বলে।
তারপর লাইনটা কেটে যায়।
দুপুরের খাবারের সময় বিশাল ব্যাঙ নিজেই ট্রাস্ট ব্যাংকের অফিসে কাতাগিরির কাছে এসে হাজির হয়।
‘বিগ বেয়ার কোম্পানির মামলাটা ভালোভাবেই মিটে গেছে, তাই না?’ বিশাল ব্যাঙ বলে।
কাতাগিরি অস্বস্তিতে পড়ে চারদিকে তাকায়।
‘চিন্তা করবেন না,’ ব্যাঙ বলে। ‘আপনি ছাড়া আর কেউই আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। তবে এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমার সত্যিকারে অস্তিত্ব আছে। আপনার কল্পনার সৃষ্টি নই। আমি কাজ করতে পারি, ফলাফল আনতে পারি। আমি একেবারে বাস্তব, জীবিত সত্তা।’
‘বলো তো, মিস্টার ব্যাঙ—’
‘প্লিজ, এক আঙুল তুলে ব্যাঙ বলে, ‘আমাকে কেবল “ব্যাঙ” বলে ডাকুন।’
‘ওকে, ব্যাঙ’ কাতাগিরি বলে, ‘তুমি তাদের সঙ্গে ঠিক কী করেছ?’
‘ওহ, তেমন কিছুই না,’ ব্যাঙ বলে। ‘বাঁধাকপি সেদ্ধ করার চেয়ে বেশি জটিল কিছু নয়। আমি শুধু ওদের একটু ভয় দেখিয়েছি। সামান্য মানসিক সন্ত্রাস। ইংরেজ ঔপন্যাসিক জোসেফ কনরাড একবার লিখেছেন—আসল সন্ত্রাস হলো সেই ভয়, যা মানুষ নিজের কল্পনার কাছ থেকেই অনুভব করে। কিন্তু সে কথা থাক। মিস্টার কাতাগিরি, বিগ বেয়ার কোম্পানির মামলাটা কেমন চলছে? ঠিকঠাকমতোই তো?’
কাতাগিরি মাথা নেড়ে আরেকটা সিগারেট ধরায়—‘মনে হচ্ছে ভালোভাবেই শেষ হবে।’
‘তাহলে বলুন তো, গত রাতে যে বিষয়টা আমি আপনার সামনে তুলেছি, সে ব্যাপারে আপনার আস্থা কি আমি অর্জন করতে পেরেছি? আপনি কি আমার সঙ্গে “বিশাল কৃমি”–এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেবেন?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাতাগিরি চশমাটা খুলে মুছে নিয়ে বলে ‘সত্যি বলতে কি, ভাবনাটা আমার খুব একটা পছন্দ নয়, কিন্তু শুধু এটুকু অনিচ্ছা দেখিয়ে যে আমি তোমার কবল থেকে রেহাই পাব, তা তো মনে হয় না।’
‘না,’ ব্যাঙ বলে। ‘এটা দায়িত্ব এবং সম্মানের বিষয়। ভাবনাটা হয়তো আপনার খুব পছন্দ নয়, কিন্তু আমাদের কোনো বিকল্প নেই: আপনাকে আর আমাকে গোপনে নেমে “কৃমি”–এর মুখোমুখি হতে হবে। যদি এই প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রাণ হারাতে হয়, কেউ আমাদের প্রতি দয়া দেখাবে না। আর যদি আমরা “কৃমি”কে হারিয়ে দিতে পারি, কেউ আমাদের প্রশংসাও করবে না। কেউ কখনো জানবে না যে তাদের পায়ের তলায় এমন যুদ্ধ হয়েছে। শুধু আপনি আর আমি জানব, মিস্টার কাতাগিরি। যেভাবেই হোক, আমাদের যুদ্ধ একা, নিঃসঙ্গই হবে।’
কাতাগিরি কিছুক্ষণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর সিগারেট থেকে উঠে আসার ধোঁয়ার দিকে চোখ ফেরায়। শেষে বলে, ‘তুমি তো জানো, মিস্টার ব্যাঙ, আমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ।’
‘শুধু “ব্যাঙ” বলবেন’, ব্যাঙ স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু এ নিয়ে কাতাগিরি আর কিছু বলে না। আগের প্রসঙ্গে যায় ‘আমি একদম সাধারণ একজন মানুষ। সাধারণের থেকেও কম। আমার মাথার চুল ঝরে যাচ্ছে, পেটও বাড়ছে, গত মাসেই চল্লিশ পাড়ি দিয়েছি। আমার পা চ্যাপ্টা। ডাক্তার কয়েক দিন আগেই বলেছে আমার ডায়াবেটিসের লক্ষণ আছে। তিন মাস বা তারও বেশি আগে শেষবারের মতো কোনো মেয়ের সঙ্গে সেক্স করেছি। আর তার জন্য আমাকে অর্থ দিতে হয়েছে। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আমার কিছু সুনাম আছে বটে, তবে তাতে সত্যিকারের কোনো সম্মান নেই। কাজের জায়গায় বা ব্যক্তিগত জীবনে আমার এমন কেউ নেই যে আমাকে ভালোবাসে। মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা আমি জানি না, অপরিচিতরা আমাকে খারাপ মনে করে, তাই বন্ধু বানাই না। কোনো খেলাধুলার ক্ষমতা, সুরবোধ নেই, তা ছাড়া আমি লম্বাও না, পুরুষাঙ্গের দুর্বলতাও আছে, দূরদর্শী নই, সর্বোপরি আমার চোখ বাঁকা। আমার জীবন তাই ভয়াবহ। আমি শুধু খাই, ঘুমাই এবং মলত্যাগ করি। আমি জানি না আমি কেন বেঁচে আছি। আমার মতো একজন মানুষকে কেন টোকিওকে বাঁচানোর কাজটা করতে হবে?’
‘হ্যাঁ, কারণ, মিস্টার কাতাগিরি, টোকিওকে বাঁচানোর জন্য আপনার মতোই একজন মানুষের দরকার। তাই আর আপনার মতো মানুষকে নিয়েই আমি টোকিও বাঁচানোর চেষ্টা করছি।’
কাতাগিরি আবার গভীর শ্বাস ফেলে, তারপর আবার আরও গভীরভাবে। ‘ঠিক আছে, তাহলে আমাকে কী করতে হবে?’
ব্যাঙ তার প্ল্যান কাতাগিরিকে বলে। তারপর ঠিক করে তারা ফেব্রুয়ারি ১৭-এর রাতে, মানে ভূমিকম্পের ঠিক এক দিন আগে গোপনে ভূগর্ভে নেমে যাবে।
তবু, মিস্টার কাতাগিরি, আমি বিশ্বাস করি না যে লড়াইয়ে ময়দানে আমাকে একা ছেড়ে দিয়ে আপনি চলে যাবেন। আমি বুঝতে পারছি একা লড়াই করা সাহসের ব্যাপার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার তা নেই। হা হা হা হা!’ ফ্রগ মুখ হাঁ করে হেসে ওঠে। তবে ব্যাঙের যে শুধু সাহসই নেই, তা নয় বরং তার তো দাঁতও নেই।
তাদের প্রবেশপথ হবে টোকিও সিকিউরিটি ট্রাস্ট ব্যাংকের শিনজুকুর শাখার বেজমেন্টের বয়লার রুম দিয়ে। তারা সেখানে রাতের শেষ দিকে মিলিত হবে। ওভারটাইম কাজ করার ছলে বিল্ডিংয়ে কাতাগিরি থাকবে। দেয়ালের অংশের পেছনে গভীরে যাওয়ার একটা গর্ত আছে। তার ১৫০ ফুট লম্বা দড়ির মই দিয়ে নামলেই তলের দিকে ‘কৃমি’কে খুঁজে পাওয়া যাবে।
‘তোমার কি কোনো যুদ্ধ করার প্ল্যান আছে?’ কাতাগিরি জিজ্ঞেস করে।
‘অবশ্যই যুদ্ধের দরকার আছে। “কৃমি”র মতো শত্রুকে পরাজিত করার জন্য যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। সে এক চ্যাটচ্যাটে প্রাণী: তার মুখ এবং মলদ্বার পার্থক্য করা যায় না। আর তার আকার কমিউটার ট্রেনের মতো লম্বা।’
‘তোমার যুদ্ধটা কেমন হবে?’
কিছুক্ষণ চিন্তা করে ব্যাঙ উত্তর দেয় ‘হুম, আমার মনে হয়—‘নীরবতা সোনার সমান?’
‘মানে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করব না?’
‘একই কথা একভাবে বলা যায়।’
‘ধরা যাক, আমি যদি শেষ মুহূর্তে ভয়ে পালিয়ে আসি। তখন তুমি কী করবে, মিস্টার ব্যাঙ?’
‘শুধু ‘ব্যাঙ।’
‘ব্যাঙ, তখন তুমি কী করবে?’
ব্যাঙ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে উত্তর দেয় ‘আমি একাই লড়াই করে যাব। একা তার বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বোধ হয় আনা কারেনিনা উপন্যাসের সেই ছুটে চলা ট্রেনটাকে হারানোর সম্ভাবনার চেয়ে সামান্যই বেশি। আপনি কি “আনা কারেনিনা” বইটা পড়েছেন, মিস্টার কাতাগিরি?’
কাতাগিরি যখন জানায় যে সে উপন্যাসটা পড়েনি, তখন তার পানে ব্যাঙ এমন এক দৃষ্টিতে তাকায় যেন বলছে—খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। তবে বোঝা যায় যে ‘আনা কারেনিনা’ উপন্যাসটা ব্যাঙের খুব পছন্দ।
‘তবু, মিস্টার কাতাগিরি, আমি বিশ্বাস করি না যে লড়াইয়ে ময়দানে আমাকে একা ছেড়ে দিয়ে আপনি চলে যাবেন। আমি বুঝতে পারছি একা লড়াই করা সাহসের ব্যাপার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার তা নেই। হা হা হা হা!’ ফ্রগ মুখ হাঁ করে হেসে ওঠে। তবে ব্যাঙের যে শুধু সাহসই নেই, তা নয় বরং তার তো দাঁতও নেই।
যদিও এ রকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা কখনো কখনো দেখা যায়।
১৭ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় কাতাগিরিকে গুলি করা হয়। সেদিনের ঋণ আদায়ের কাজ শেষ করে ট্রাস্ট ব্যাংকের অফিসে ফিরে যাওয়ার পথে শিনজুকুর রাস্তায় পা দেওয়ার পর হঠাৎ তার সামনে চামড়ার জ্যাকেট পরা এক তরুণ এসে দাঁড়ায়। তার চোখ-মুখে কোনো ভাবভঙ্গি দেখা যায়নি। তবে এক হাতে চেপে ধরা ছিল ছোট একটা কালো পিস্তল। অস্ত্রটা এতটাই ছোট আর এতটাই কালো ছিল যে একে সত্যিকারের অস্ত্র বলেই মনে হয়নি। তাই তার হাতে ধরা জিনিসটার দিকে কাতাগিরি থির চোখে তাকিয়ে থাকে। তবে তা যে তার দিকেই তাক করা, আর তরুণ যে ট্রিগার টানছে, তা–ও কাতাগিরি লক্ষ করেনি। তারপর সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যায় যে তার কাছে এর কোনো অর্থই দাঁড়ায় না। কিন্তু পিস্তলটা সত্যিই গর্জে ওঠে।
কাতাগিরি দেখে পিস্তলের নলটা বাতাসে ঝাঁকুনি খায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অনুভব করে—কেউ যেন ভারী হাতুড়ি দিয়ে তার ডান কাঁধে আঘাত করছে। কোনো ব্যথা সে টের পায় না, কিন্তু সেই ধাক্কায় সে ফুটপাতে ছিটকে পড়ে। ডান হাতে ধরা চামড়ার ব্রিফকেসটা উল্টো দিকে উড়ে যায়। তখন তার দিকে তরুণটা আবার বন্দুক তাক করে। দ্বিতীয় একটা গুলির শব্দ হয়। তার চোখের সামনেই পাশের এক ছোট খাবারের দোকানের ফুটপাতের সাইনবোর্ড ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। কাতাগিরি মানুষের চিৎকার শুনতে পায়। তার চশমা খুলে উড়ে গেছে, চারপাশ সব ঝাপসা হয়ে আসে। অস্পষ্টভাবে সে বুঝতে পারে যে তার দিকে তরুণটা পিস্তল তাক করে আবার এগিয়ে আসছে। কাতাগিরি ভাবে আমি মারা যাচ্ছি। ব্যাঙ বলেছিল, সত্যিকারের ভয় হলো সেই ভয়, যা মানুষ নিজের কল্পনায় অনুভব করে। কাতাগিরি তার কল্পনার সুইচ বন্ধ করে দেয় এবং ওজনহীন এক নীরবতায় তলিয়ে যায়।
সে যখন জেগে ওঠে তখন দেখে সে বিছানায় শোয়া। এক চোখ খুলে কিছুক্ষণ চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করে, তারপর অন্য চোখটাও খোলে। প্রথমেই তার চোখে পড়ে বিছানার মাথার কাছে রাখা একটা ধাতব স্ট্যান্ড আর সে স্ট্যান্ড থেকে তার শরীর পর্যন্ত নেমে আসা একটা স্যালাইনের নল। এরপর সাদা পোশাক পরা একজন নার্সকে চোখে পড়ে। বুঝতে পারে, সে শক্ত একটা বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে এবং শরীরে অদ্ভুত এক ধরনের পোশাক পরানো, যার ভেতরে সে সম্ভবত নগ্ন।
আচ্ছা হ্যাঁ, সে মনে মনে ভাবে, ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় কোনো লোক আমাকে গুলি করে। সম্ভবত কাঁধে। ডান কাঁধে। সে দৃশ্যটা আবার মনে মনে ভেবে দেখে। তরুণ লোকটার হাতে থাকা ছোট কালো পিস্তলটার কথা মনে পড়তেই তার হৃৎপিণ্ডটা অস্বস্তিকরভাবে ধক করে ওঠে—হারামজাদাগুলো আমাকে মারতে চেয়েছিল! সে ভাবে। কিন্তু মনে হচ্ছে আমি কোনোমতে বেঁচে গেছি। আমার স্মৃতি ঠিক আছে। কোনো ব্যথা নেই। শুধু ব্যথাই নেই তা নয়—একদম কোনো অনুভূতিই নেই। আমি আমার হাত তুলতে পারছি না…
হাসপাতালের ঘরটায় কোনো জানালা নেই। তাই এখন দিন না রাত, সে তা বুঝতে পারে না। বিকেল পাঁচটার একটু আগে তাকে গুলি করা হয়। তারপর থেকে কতটা সময় কেটে গেছে? ব্যাঙের সঙ্গে তার রাতের গোপন সাক্ষাতের সময়টা কি পেরিয়ে গেছে? কাতাগিরি ঘরের ভেতর একটা ঘড়ি খোঁজে, কিন্তু চশমা না থাকায় দূরের কিছুই সে দেখতে পায় না।
‘এক্সকিউজ মি,’ সে নার্সকে ডাকে।
‘ওহ, ভালো, শেষ অবধি আপনার হুঁশ ফিরেছে,’ নার্স বলে।
‘এখন কয়টা বাজে?’
নার্স তার হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে ‘সোয়া নয়টা।’
‘রাত?’
‘বোকামি করবেন না, সকাল!’
‘সকাল নয়টা পনেরো?’ কাতাগিরি কাতর স্বরে গোঙায়, বালিশ থেকে মাথাটা একটু তুলতে গিয়েই কষ্ট পায়। তার গলা থেকে বেরোনো ভাঙা আওয়াজটা যেন অন্য কারও কণ্ঠস্বর বলে মনে হয়। ‘ফেব্রুয়ারির আঠারো তারিখ, সকাল নয়টা পনেরো?’
‘ঠিকই, নার্স আবার হাত তুলে তার ডিজিটাল ঘড়িতে তারিখটা দেখে বলে। ‘আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫।’
‘আজ সকালে টোকিওতে কি কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি?’
‘টোকিওতে?’
‘হ্যাঁ, টোকিওতেই।’
নার্স মাথা নাড়ে—‘না, আমার জানামতে তো হয়নি।’
কাতাগিরি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যা-ই হয়ে থাকুক, অন্তত ভূমিকম্পটা এড়ানো গেছে।
‘আমার ক্ষতটা এখন কেমন?’
‘আপনার ক্ষত?’ নার্স জিজ্ঞেস করে। ‘কোন ক্ষত?’
‘শরীরের যেখানে আমাকে গুলি করা হয়েছে।’
‘গুলি?’
‘হ্যাঁ, ট্রাস্ট ব্যাংকের গেটের কাছে। কোনো তরুণ লোক আমাকে গুলি করে। মনে হয় ডান কাঁধে।’
তার দিকে তাকিয়ে নার্স এবার একটু নার্ভাস হাসি হেসে বলে, ‘সরি, মিস্টার কাতাগিরি, কিন্তু আপনাকে তো গুলি করা হয়নি।’
‘হয়নি? আপনি শিওর?
‘আজ সকালে কোনো ভূমিকম্প হয়নি—এ ব্যাপারে আমি যতটা নিশ্চিত, ঠিক ততটাই নিশ্চিত যে আপনাকে গুলি করা হয়নি।
কাতাগিরি হতভম্ব হয়ে যায়—‘তাহলে আমি হাসপাতালে কেন?’
‘কেউ একজন আপনাকে শিনজুকুর কাবুকিচো এলাকার রাস্তায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তুলে হাসপাতালে আনে। আপনার শরীরে কোনো ক্ষত নেই। আপনি শুধু অচেতন ছিলেন। আর কেন অচেতন হন, সেটাও আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। ডাক্তার একটু পরেই আসবেন। আপনার তার সঙ্গেই কথা বলা উচিত।’
রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম? কাতাগিরির দৃঢ় বিশ্বাস, সে নিজের দিকে তাক করে গুলিটা ছুড়তে দেখেছিল। সে গভীর শ্বাস নেয় এবং মাথাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। সে ঠিক করে, আগে সব তথ্য গুছিয়ে নেয়।
‘আপনি যা বলছেন তার মানে কি এই—গতকাল বিকেলের থেকেই আমি এই হাসপাতালের বিছানায় অচেতন হয়ে পড়ে আছি, তাই তো?’
‘ঠিক তাই,’ নার্স বলে। ‘আর আপনার রাতটা খুবই খারাপ কেটেছে, মিস্টার কাতাগিরি। নিশ্চয়ই ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন দেখছেন। আমি শুনেছি আপনি বারবার চিৎকার করেছেন, “ব্যাঙ! এই, ব্যাঙ!”—খুব বেশিবার। আপনার কি “ব্যাঙ” নামে ডাকনামওয়ালা কোনো বন্ধু আছে?’
কাতাগিরি চোখ বন্ধ করে এবং নিজের হৃদয়ের ধীর, ছন্দময় শব্দ শোনে—যেন তা তার জীবনের মিনিটগুলো গুনে দিচ্ছে। সে যা কিছু মনে করতে পারছে, তার কতটা সত্যিই ঘটেছে, আর কতটাই–বা ছিল বিভ্রম? ব্যাঙ কি সত্যিই ছিল, আর ভূমিকম্প থামাতে সে কি ‘কৃমি’র সঙ্গে লড়াই করেছে? নাকি সবই এক দীর্ঘ স্বপ্নের অংশ? এখন আর কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা—কাতাগিরির কিছুই বোঝার উপায় থাকে না।
কিন্তু সে রাতেই তার হাসপাতালের ঘরে ব্যাঙ আসে। আবছা আলোয় কাতাগিরির ঘুম ভেঙে যায়। দেখে ব্যাঙ একটা ইস্পাতের ভাঁজ করা চেয়ারে বসে আছে, পিঠ দেয়ালে ঠেস দেওয়া। ব্যাঙের বড় বড় ফোলা সবুজ চোখের পাতা সরু এক রেখার মতো বন্ধ।
‘ব্যাঙ!’ তাকে কাতাগিরি ডেকে ওঠে।
ব্যাঙ ধীরে ধীরে চোখ খোলে। তার বড় সাদা পেটটা শ্বাসের তালে তালে ওঠানামা করে।
‘আমি যেমন কথা দিয়েছি, রাতে বয়লার রুমে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি,’ কাতাগিরি বলে, ‘কিন্তু সন্ধেবেলা একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়—একেবারেই অপ্রত্যাশিত—আর ওরা আমাকে এখানে নিয়ে আসে।’
ব্যাঙ হালকা করে মাথা নাড়ে। ‘আমি জানি। ঠিক আছে। চিন্তা কোরো না। আমার লড়াইয়ে আপনি আমাকে দারুণ সাহায্য করেছন, মিস্টার কাতাগিরি।’
‘আমি কী করেছি?’
‘হ্যাঁ, আপনি করেছেন। আপনার স্বপ্নের মধ্যেই আপনি অসাধারণ কাজ করেছেন। ঠিক সেই কারণে আমি কৃমির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে পেরেছি। আমার জয়ের জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।’
‘আমি বুঝতে পারছি না,’ কাতাগিরি বলে। ‘আমি পুরো সময় অচেতন থেকেছি। আমাকে শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। তার মাঝে আমি স্বপ্নে কিছু করেছি মনে করতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে, মিস্টার কাতাগিরি। আপনার মনে না থাকাই ভালো। ভয়ানক লড়াইয়ের পুরোটা হয়েছে কল্পনার জগতে। আমাদের যুদ্ধের ময়দানের সঠিক জায়গা সেটাই। এখানেই আমরা আমাদের জয় এবং পরাজয় বোধ করি। আমরা প্রত্যেকেই সীমিত সময়ের মানুষ: শেষ অবধি আমরা সবাই হেরে যাই। যেমনটা সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমাদের জীবনের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয় আমরা কীভাবে হেরে যাই তা থেকে, কীভাবে আমরা জিতি, তা দিয়ে নয়। তবে আপনি এবং আমি একসঙ্গে, মিস্টার কাতাগিরি, টোকিওকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি। আমরা এক লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়েছি। কেউ জানে না, কিন্তু সেটাই আমরা করেছি।’
‘তুমি কীভাবে কৃমিকে পরাজিত করতে পেরেছ? সেখানে আমি কী করেছি?’
‘আমরা আমাদের সবকিছুই শেষ মুহূর্ত অবধি লড়াইয়ে দিয়েছি। আমরা—’
ব্যাঙ হঠাৎ মুখ বন্ধ করে এবং গভীর শ্বাস নেয়, ‘—আমরা আমাদের হাতের সব কটি অস্ত্রই ব্যবহার করেছি , মিস্টার কাতাগিরি। আমাদের জড়ো করা সমস্ত সাহস আমরা ব্যবহার করেছি। অন্ধকার ছিল আমাদের শত্রুর হাতিয়ার। আপনি ফুট-পাওয়ার জেনারেটর নিয়ে এলেন এবং আপনার সব শক্তি ব্যবহার করে আমরা পুরো জায়গা আলোয় ভরিয়ে দিই। “সুবিশাল কৃমি” অন্ধকারের ভুতুড়ে ছায়ার মাধ্যমে আপনাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু আপনি স্থির থেকেছেন। আর তখন আলো আর আঁধারের মধ্যে যে ভয়ানক লড়াই হয়, তাতে আলোতে আমি সেই দৈত্যাকৃতির কৃমির সঙ্গে লড়াই করে যাই। সে নিজেকে আমার চারপাশ থেকে গুঁজে ধরে এবং আমাকে তার ভয়ংকর চ্যাটচ্যাটে লালা দিয়ে ঢেকে দেয়। আমি তাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলি, তবু সে মারা যায় না। সে যা করে তা হলো নিজেকে আরও ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেয়। তারপর—’
ব্যাঙ চুপ হয়ে যায় কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই, যেন তার শেষ শক্তি জড়ো করে সে আবার কথা বলতে শুরু করে ফিওদর দস্তয়েভস্কি অতুলনীয় কোমলতায় বর্ণনা করেছেন তাদের, যারা ঈশ্বরের দ্বারা ত্যাগপ্রাপ্ত। তিনি আবিষ্কার করেছেন মানুষের অস্তিত্বের মূল্যবান গুণাবলি সেই ভয়ানক বিরোধের মধ্যে, যেখানে মানুষই ঈশ্বরকে আবিষ্কার করেছে, অথচ সেই ঈশ্বরের দ্বারা তারা পরিত্যক্ত। কৃমির সঙ্গে আঁধারে লড়াই করতে গিয়ে আমি নিজেই দস্তয়েভস্কির ‘হোয়াইট নাইটস’ উপন্যাসের কথা ভেবে নিয়েছি। আমি… ব্যাঙের কথা যেন আটকে যায়।
‘মিস্টার কাতাগিরি, যদি আমি একটু ঘুমাই, আপনার কোনো কোনো আপত্তি আছে? আমি সম্পূর্ণ ক্লান্ত।’
‘কোনো আপত্তি নাই,’ কাতাগিরি বলে। ‘ভালো করে গভীর ঘুমিয়ে নাও।’
‘শেষ পর্যন্ত আমি কৃমিকে পরাজিত করতে পারিনি,’ চোখ বন্ধ করে ব্যাঙ বলে। ‘আমি ভূমিকম্প থামাতে সক্ষম হয়েছি, কিন্তু আমাদের লড়াই কেবল সমতায় চলেছে। আমি তাকে আঘাত করেছি এবং সে আমাকে। কিন্তু সত্যি বলতে, মিস্টার কাতাগিরি …’
‘কী হয়, ব্যাঙ?’
‘আমি নিঃসন্দেহে একটা খাঁটি “ব্যাঙ”, কিন্তু একসঙ্গে আমি এমন এক কিছুর প্রতীক, যা ব্যাঙ নয় তার জগৎকে প্রতিনিধিত্ব করে।’
‘হুম, কী বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘আমিও পারছি না,’ ব্যাঙ বলে, চোখ বন্ধ রেখেই। ‘এটা শুধু একটা অনুভূতি। আপনি যা চোখে দেখেন, তা অবশ্যই বাস্তব নয়। আমার শত্রু হলো, অন্য অনেক কিছুর মধ্যে, আমার ভেতরের আমি। আমার ভেতরের আমি “ব্যাঙ নয়”-এর আমি। আমার মস্তিষ্ক কাদা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি সত্যিই চাই আপনি বুঝুন আমি কী বলতে চাই, মিস্টার কাতাগিরি।’
‘তুমি ক্লান্ত, ব্যাঙ। ঘুমিয়ে পড়ো। তাহলে সুস্থ হয়ে উঠবে।’
‘আমি ধীরে ধীরে, ধীরে কাদার দিকে ফিরে যাচ্ছি, মিস্টার কাতাগিরি। তবু…আমি…’
ব্যাঙ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে কোমায় চলে যায়। তার বাহু প্রায় মেঝে পর্যন্ত ঝুলে পড়ে, আর বড় চওড়া মুখটা অর্ধখোলা অবস্থায় লটকিয়ে যায়। তার ওপর চোখের পুরো ফোকাস ফেলে কাতাগিরি দেখতে পায় যে ব্যাঙের পুরো শরীরজুড়ে গভীর কাটা দাগ। তার ত্বকে বিচিত্র রঙের ছোপ ছোপ ছাপ ছড়িয়ে আছে এবং মাথার এক জায়গায় মাংস ছিঁড়ে যাওয়ায় একটা গহ্বর দেখা দিয়েছে।
কাতাগিরি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাঙের দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে সে ঘুমের মোটা পর্দায় নিজেকে ঢেকে নিয়ে বসে আছে। তাই কাতাগিরি ভাবে যে এই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আমি ‘আনা কারেনিনা’ এবং ‘হোয়াইট নাইটস’ বই দুটি কিনে পড়ব। তারপর ব্যাঙের সঙ্গে এগুলো নিয়ে একটা দীর্ঘ সাহিত্যিক আলোচনা করে নেব।
কিন্তু অচিরেই ব্যাঙের পুরো দেহে অদ্ভুতভাবে কাঁপাকাঁপি শুরু করে। প্রথমে কাতাগিরির মনে হয় তা শুধু ঘুমের স্বাভাবিক অচেতন নড়াচড়া, কিন্তু খুব দ্রুত সে বুঝতে পারে যে তা ঠিক নয়। বরং ব্যাঙের দেহের নড়াচড়ায় অস্বাভাবিক কিছু। কোনো বড় পুতুলকে পেছন থেকে কারও ঝাঁকানির মতো।
কাতাগিরি নিশ্বাস ধরে রেখে ব্যাঙের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে ব্যাঙের কাছে যেতে চেয়েছিল কিন্তু ব্যাঙ নিজেই অচল হয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাঙের ডান চোখের ওপরে একটা বড় গুটি গজিয়ে ফুলে ওঠে। একই ধরনের বিশাল, কুৎসিত ফোলা গুটি তার কাঁধ ও তার আশপাশেও বের হতে থাকে এবং একসময় পুরো শরীরজুড়ে তা দেখা দেয়। কাতাগিরি তাই কিছুতেই বুঝতে পারে যে ব্যাঙের কী হয়েছে। সে কেবল নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ, একটা ফোলা গুটি ধন ধন শব্দ করে ফেটে যায়। তাতে করে ত্বক উড়ে গেলে এক ধরনের চ্যাটচ্যাটে তরল বের হলে তার ভয়ানক দুর্গন্ধ পুরো কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। বাকি ফোলা গুটিগুলোও একটার পর একটা ফেটে যেতে থাকে, মোট প্রায় বিশ থেকে ত্রিশটা গুটি ফেটে যাওয়ায় তার ত্বক ও তরল ছুটে গিয়ে দেয়ালে আছড়ে পড়ে। শোচনীয়, অর্ধসহ্যযোগ্য দুর্গন্ধে হাসপাতালের রুমটা ভরে যায়।
ব্যাঙের শরীরের যে জায়গা থেকে ফোলা গুটিগুলো ফেটে যায়, সেখানে বড় বড় কালো গর্ত তৈরি হয়। তা থেকে টলমলে নড়াচড়া করা, আবার মাথাওয়ালা নানা আকারের কৃমির মতো পোকামাকড় বের হতে থাকে। সব ফোলা ফোলা সাদা কৃমি। তাদের পর ছোট, শত শত পাওয়ালা পোকামাকড়ের মতো প্রাণী পায়ে ভয়ংকর ঝনঝন শব্দ তুলে বের হয়ে আসে। গর্তগুলো থেকে এই সব জীবজন্তুর বের হওয়ার ধারা কিছুক্ষণ ধরে অবিরাম চলে। ফলে অচিরেই ব্যাঙের শরীর—অথবা যা একসময় ব্যাঙের শরীর ছিল, তার পুরোই এই অদ্ভুত পোকামাকড়কুলে ঢেকে যায়।
তার দুটি বড় চোখের বল চোয়ালে নেমে গেলে তা শক্ত চোয়ালযুক্ত কালো পোকামাকড়ে খেয়ে ফেলে। চ্যাটচ্যাটে কৃমির দল দেয়াল ধরে ছাদে দৌড়ে উঠে পড়ে, তাদের শরীরের নিচে ফ্লুরোসেন্ট বাতিগুলো ঢেকে যায় এবং তারা স্মোক অ্যালার্মের ভেতরে গর্ত তৈরি করা শুরু করে দেয়।
মেঝেটাও কৃমি আর পোকামাকড়ে ঢেকে যায়। তারা বাতির ওপর উঠে আলো ঢেকে দেয় এবং স্বাভাবিকভাবেই, কাতাগিরির বিছানাতেও উঠে আসে। শত শত কৃমি চাদরের নিচে ঢুকে পড়তে থাকে। তারা তার পা বেয়ে ওপরে ওঠে, নাইটগাউনের ভেতর দিয়ে ঊরুর ফাঁকে ফাঁকে চলে যায়। সবচেয়ে ছোট কৃমি আর পোকাগুলো কাতাগিরির মলদ্বার, কান আর নাকের ছিদ্রে ঢুকে পড়ে। শত পাওয়ালারা মুখ খুলে নিয়ে একের পর এক ভেতরে ঢুকতে থাকে। তীব্র হতাশা ও আতঙ্কে ভীত হয়ে কাতাগিরি চিৎকার করে ওঠে।
হঠাৎ কেউ সুইচ টিপে দেয়, ফলে ঘর আলোয় ভরে যায়।
‘মিস্টার কাতাগিরি! নার্স ডাকে। কাতাগিরি আলোয় চোখ মেলে তাকায়। তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। পোকামাকড়গুলো উধাও। তারা তার মধ্যে রেখে গেছে শুধু এক ভয়ানক চ্যাটচ্যাটে অনুভূতি।
‘আবার খারাপ স্বপ্ন দেখলে তাই না? আহা বেচারা।’ দ্রুত ও অভ্যস্ত ভঙ্গিতে নার্স একটা ইনজেকশন প্রস্তুত করে কাতাগিরির বাহুতে সুচ ঢুকিয়ে দেয়।
কাতাগিরি লম্বা, গভীর শ্বাস নিয়ে আস্তেধীরে তা ছাড়ে। তার হৃৎপিণ্ড প্রচণ্ডভাবে ধুকপুক করে। একবার যেন ফুলে ওঠে আর সংকুচিত হয়ে যায়।
‘কী স্বপ্ন দেখেছেন?
কাতাগিরির স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে কষ্ট হয়।
‘চোখে যা দেখো, তা সব সময় বাস্তব নয়,’ সে নিজেকেই নিজে জোরে বলে।
‘একদম ঠিক কথা,’ নার্স হেসে বলে। ‘বিশেষ করে স্বপ্নের ব্যাপারস্যাপার।’
‘ব্যাঙ,’ কাতাগিরি বিড়বিড় করে বলে।
‘ব্যাঙের কি কিছু হয়েছে?’ নার্স জিজ্ঞেস করে।
‘সে একাই টোকিওকে ভূমিকম্পে ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে।’
‘ভালোই তো,’ নার্স বলে। সে কাতাগিরির প্রায় ফুরিয়ে আসা স্যালাইনের প্যাকেট বদলে নতুন একটা লাগিয়ে দেয়। ‘টোকিওতে আর কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটার দরকার নেই। এমনিতেই এখানে যথেষ্ট আছে।’
‘কিন্তু তার জন্য তো ব্যাঙের নিজের জীবন দিতে হয়েছে। সে আর নেই। আমার মনে হয় সে কাদায় ফিরে গেছে। সে আর কখনো এখানে আসবে না।’
নার্স হালকা হাসি নিয়ে কাতাগিরির কপালের ঘাম মুছে দিয়ে বলে ‘আপনি ব্যাঙকে খুব স্নেহ করতেন, তাই না, মিস্টার কাতাগিরি?’
‘অবশ্যই’ কাতাগিরি অস্পষ্ট স্বরে বলে। ‘সবার চেয়ে বেশি স্নেহ করি।’
তারপর সে চোখ বন্ধ করে এবং শান্ত, স্বপ্নহীন ঘুমে তলিয়ে যায়।