কাজাখস্তানের নদীতে বরফ ভাঙতে ডিনামাইট লাগছে
· Prothom Alo

নদীর মাঝে কখনো ডিনামাইটের মতো শক্তিশালী বোমা ফুটতে দেখেছো? হলিউডের সিনেমায় এমন দৃশ্য থাকলেও এবার বাস্তবেই ঘটছে এমন ঘটনা। মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানের নদীর বুকেই চলছে এই ধ্বংসযজ্ঞ।
কাজাখস্তানের শীত মানেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। নদীগুলো জমে গিয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। বিপত্তি বাঁধে তখন, যখন বসন্তের শুরুতে বরফ গলতে শুরু করে। বড় বড় বরফের চাঁই নদীর বাঁকে বা ব্রিজের নিচে আটকে গিয়ে তৈরি করে ‘আইস জ্যাম’ বা বরফের বাঁধ। এর ফলে নদীর পানি আর সামনে যেতে পারে না, উল্টো ফুলেফেঁপে উঠে ভাসিয়ে দেয় পাশের গ্রাম আর শহর। এটাকে বলে ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ বা হঠাৎ বন্যা।
Visit newsbetting.bond for more information.
এই মহাবিপদ থেকে বাঁচতে কাজাখস্তানের উদ্ধারকারী দলগুলো আগেভাগেই মাঠে নেমে গেছে। তাদের হাতে আছে ভারী ড্রিল মেশিন আর প্রচুর ডিনামাইট। তারা নদীর শক্ত বরফ ফুটো করে ভেতরে ডিনামাইট ঢুকিয়ে দিয়ে সেগুলো বিস্ফোরণ করছে। ডিনামাইট বিস্ফোরণ হতেই আকাশের দিকে বেশ উঁচুতে উঠে যায় বরফ আর পানির ফোয়ারা। এই বিস্ফোরণ বরফকে পুরোপুরি গলিয়ে দেয় না, বরং বরফের শক্ত কাঠামোকে গুঁড়ো করে দেয়। ফলে পানি বাড়লে বরফগুলো জমে না থেকে পানির সঙ্গে সহজেই ভেসে চলে যায়। কাজাখস্তানের অনেক হ্রদেও (যেমন ইমানতাউ লেক) এবার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, যাতে পানি উপচে পাশের গ্রামে না ঢোকে। প্রায় ৯০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে।
বনের দৈত্য বিগফুট আসলে কে২০২৪ সালে কাজাখস্তানে গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। তখন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই কাজাখস্তান সরকার ২০২৬ সালের জন্য তাদের বাজেট ও প্রস্তুতি—দুটোই কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাশিম-জোমার্ট তোকায়েভ ২০২৪ সালের বন্যাকে গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আগের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা ২০২৫ ও ২০২৬ সালে নদীগুলোয় ডিনামাইট ব্যবহারের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। ২০২৬ সালে কাজাখস্তান সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৪৮.৭ বিলিয়ন টেঙ্গে (কাজাখ মুদ্রা) খরচ করার পরিকল্পনা করেছে। বন্যা মোকাবিলায় প্রায় ৩৯ হাজার উদ্ধারকর্মী এবং ১৮ হাজারটিরও বেশি বিশেষ যন্ত্রপাতি (যেমন বোট, পাম্পার ও এয়ারক্রাফট) প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কাজাখস্তানের অনেক জায়গায় বরফ প্রায় ৩০ ইঞ্চি (প্রায় ২.৫ ফুট) পর্যন্ত পুরু হয়। তাই সাধারণ কোনো হাতুড়ি দিয়ে এই বরফ ভাঙাও সম্ভব নয়। বিশেষ করে আকতোবে (Aktobe) এবং পূর্ব কাজাখস্তান অঞ্চলে এই ডিনামাইট বিস্ফোরণ সবচেয়ে বেশি করা হয়। কারণ, সেখানে বরফ সবচেয়ে পুরু থাকে। তাই প্রকৌশলীদের একটি বিশেষ দল নিখুঁত হিসাব করে দেখেন কতটুকু ডিনামাইট দিলে নদীর ক্ষতি হবে না, কিন্তু বরফ ঠিকই ভাঙবে। তবে এ বছরে নদীর পানির উচ্চতা মাপতে মানুষ নয়, বরং ড্রোনের এক বিশাল বাহিনী কাজ করছে। এই ড্রোনগুলো রিয়েল টাইমে কন্ট্রোল রুমে খবর পাঠায় যে কোথায় বরফ জমছে বা পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে।
কম্বোডিয়ার গুহায় পাওয়া গেছে নতুন জাতের পিট ভাইপার সাপবিস্ফোরণের পাশাপাশি কাজাখস্তান সরকার এবার নদীগুলোর তলদেশ গভীর করার (ড্রেজিং) কাজ করছে। প্রায় ১৬৬ কিলোমিটার নদীপথ তারা পরিষ্কার করেছে। এমনকি তারা ‘Tasqyn’ নামে একটি বিশেষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স সিস্টেম ব্যবহার করছে, যা ড্রোনের সাহায্যে নদীর পানির উচ্চতা মেপে আগেভাগেই জানিয়ে দেয়, কোথায় বন্যা হতে পারে। ডিনামাইট বিস্ফোরণ করার আগে এই সিস্টেম দিয়েই ঠিক করা হয় কোন জায়গাটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কাজাখস্তান এবার এই কাজে স্যাটেলাইট ইমেজও ব্যবহার করছে। মহাকাশ থেকে তোলা ছবি দেখে তারা বুঝতে পারে নদীর নিচের স্তরে বরফ কতটুকু জমেছে।
কাজাখস্তানের উদ্ধারকর্মীরা বরফ গলানোর জন্য ডিনামাইটের পাশাপাশি অনেক সময় বরফের ওপর কয়লার গুঁড়ো বা কালো বালু ছিটিয়ে দেন। কারণ, সাদা বরফ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে দেয়, কিন্তু কালো রং সূর্যের তাপ শুষে নেয়। ফলে বরফ অনেক দ্রুত গলতে শুরু করে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কাজাখস্তানকে সাহায্য করছে ইউনেসকো, জাপান ও জাতিসংঘ (UNDP)। তারা মিলে আধুনিক ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ তৈরি করছে, যাতে সাধারণ মানুষ বন্যার অন্তত কয়েক দিন আগে খবর পেয়ে নিরাপদ জায়গায় যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: নিউজ ডট কম ডট এইউকিছু শিশু কেন এত চিকেন ফ্রাই পছন্দ করে