ভূমধ্যসাগরের কোলে লুকানো লারনাকা

· Prothom Alo

নীল জল, প্রাচীন ইতিহাস আর ধীরস্থির জীবনযাপনের মায়ায় ঘেরা লারনাকা ধীরে ধীরে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়—এক শহর, যা চোখে নয়, অনুভবে ধরা দেয়।

ইউরোপের প্রায় ৩৫টি দেশে ঘুরে বেড়ানোর পর, সাইপ্রাসের ছোট্ট কিন্তু প্রাচীন বন্দরনগরী লারনাকায় পা না রাখলে অনেক কিছুই আমার অজানাই থেকে যেত। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাড়ে অবস্থিত এ  শহর প্রথম দর্শনেই অদ্ভুত মোহ জাগাতে বাধ্য। লারনাকা এমন একটি জায়গা, যা ইউরোপের অন্যান্য চাকচিক্যময় শহরের মতো প্রথম দেখাতেই আপনাকে চমকে দেবে না, বরং এর স্নিগ্ধতা আর প্রাচীনত্বের আবেদন একটু একটু করে আপনাকে মুগ্ধ করবে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ভুমধ্য সাগর তীরের ম্যাকেঞ্জি বিচ

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় যখন কনকনে শীত আর তুষারপাত, তখন বিমানের জানালা দিয়ে লারনাকার নীলচে জলরাশি, দূরের পাহাড় আর আধুনিক দালানকোঠার এক অপূর্ব কোলাজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। লউডামোশন কিংবা রায়ানএয়ারের মতো বাজেট এয়ারলাইনসে দীর্ঘ যাত্রার যে ক্লান্তি ও শারীরিক অস্বস্তি জমা হয়েছিল, লারনাকার এই মোহনীয় রূপ দর্শনে তা এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়। চার ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষে লারনাকা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম।

শীতের মৌসুমেও পাতলা টি-শার্ট পরে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটার মতো এমন চমৎকার আবহাওয়া ইউরোপের অন্য কোথাও চট করে মেলে না। বিমানবন্দর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরেই শহরের প্রাণকেন্দ্র। দেড় ইউরো দিয়ে বাসে চেপে শহরতলিতে প্রবেশ করতেই লারনাকার আসল রূপ ধরা দিতে শুরু করে। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মতো এখানকার রাস্তাঘাট বা দালানকোঠা খুব একটা আধুনিক নয়, বরং পুরো শহরে লেপ্টে আছে একধরনের প্রাচীন মায়া। সাইপ্রাস এককালে ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই এখানকার প্রায় সবাই চমৎকার ইংরেজি বলতে পারেন এবং যুক্তরাজ্যের মতো রাস্তার বাঁ পাশ দিয়ে গাড়ি চালানোর নিয়মটি আজও এ দেশে বহাল রয়েছে।

রাতে থাকার জন্য ‘ওয়েলকাম হাউস’ নামের একটি হোস্টেল আগেই বুক করা ছিল। এর মালিক স্পেনের বিলবাও থেকে আসা ডেভিড, যিনি সাইপ্রাসের প্রেমে পড়ে এখানেই থিতু হয়েছেন। স্প্যানিশ, ইংরেজি ও আরবি—এ তিন ভাষায় পারদর্শী মানুষটির অমায়িক আতিথেয়তা এবং সাবলীল কথাবার্তায় লারনাকাকে মুহূর্তেই বেশ আপন লাগতে শুরু করল।

ডেভিডের সঙ্গে লেখক

পরদিন এই রসিক ডেভিডের সঙ্গেই বেরিয়ে পড়ি প্রাচীন শহরের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস আবিষ্কারে। ঘুরতে ঘুরতেই তাঁর কাছ থেকে লারনাকার বর্তমান অর্থনীতি ও জনজীবন সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারি। এককালে সাইপ্রাসের মানুষ কাজের খোঁজে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমালেও, এখন উল্টো রাশিয়া, বেলারুশ বা ইউক্রেনের বিত্তবানরা এই দ্বীপকে নিজেদের ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়েছেন। তবে বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার সরকারি নীতির কারণে অনেক দুর্নীতিবাজও এখানে আস্তানা গেড়েছে বলে ডেভিড আক্ষেপ করলেন।

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল লারনাকা সল্টলেকের তীরে অবস্থিত পবিত্র ‘হালা সুলতান টেক্কে’। অটোমান আমলে নির্মিত এই মসজিদ ইসলামের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ধারণ করে আছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর খালা উম হিরাম বিনতে মিলহালনের (রা.) সমাধিস্থলকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ মসজিদের প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করা যায়।

হালা সুলতান টেক্কেমহানবীর (সা.) খালা উম হিরাম বিনতে মিলহানের (রা.)-এর সমাধি

সপ্তম শতাব্দীতে সাইপ্রাসে ইসলামের আগমনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থান। হালা সুলতান টেক্কের চারপাশ ঘিরে থাকা সুবিশাল লারনাকা সল্টলেকের সৌন্দর্য শীতকালে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য। গ্রীষ্মকালে লেকের পানি শুকিয়ে গেলেও, শীতের বৃষ্টিতে এটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসা হালকা লবণের ঘ্রাণ শরীর ও মনকে সতেজ করে তোলে। লেকের শান্ত জলে গোলাপি ফ্লেমিংগো আর সিগালসহ প্রায় ৮৫ প্রজাতির পাখির জলকেলি জাদুকরি ক্যানভাস তৈরি করে। একসময় এই লেক ঘিরে ব্যাপক আকারে লবণের চাষাবাদ হতো, যা আশি বা নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সাইপ্রাসের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

সেখান থেকে আমরা পা বাড়াই ‘কামারাস অ্যাকোয়াডাক্ট’-এর দিকে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অটোমান গভর্নর আবু বকর পাশার নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এই প্রাচীন পানি সরবরাহ ব্যবস্থাটি লারনাকার ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। সুদীর্ঘ খিলান বা আর্চগুলোর সারি দূর থেকেই পথচারীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। গ্রিক ভাষায় ‘কামারাস’ শব্দের অর্থই হলো খিলান।

কামারাস অ্যাকোয়াডাক্ট

সেই যুগে পাথরের তৈরি এই বিশাল কাঠামোটি বহুদূর থেকে শহরের মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য মিঠাপানি বয়ে আনত। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে লারনাকার মানুষের জীবনধারণের অন্যতম ভরসা ছিল এই অ্যাকোয়াডাক্ট, যা বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সচল ছিল। বর্তমানে এটি কেবল অতীত ঐতিহ্যের এক দৃষ্টিনন্দন স্মারক হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। এর নিচ দিয়ে হাঁটার সময় অতীত ইতিহাসের রোমাঞ্চ অনুভব করা যায়। এই প্রাচীন স্থাপত্যের নীরবতা আর বিশালতা লারনাকার সমৃদ্ধ অতীতের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।

দুপুরে যাই শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা ম্যাকেনজি বিচের দিকে। কোলাহলমুক্ত এই সমুদ্রসৈকতের গাঢ় নীল জলরাশি আর পামগাছের সারি মন কেড়ে নেয়। সাইপ্রাসে সাগরের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো এর স্ফটিক স্বচ্ছ রূপ। এই নীল জল এতটাই পরিষ্কার যে সাগরের বুকে ভাসমান সামান্য পরিমাণ ময়লা বা আবর্জনাও কোথাও চোখে পড়বে না। একেবারে দাগহীন, আয়নার মতো স্বচ্ছ এই গাঢ় নীল জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে নিমেষেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। পরিচ্ছন্নতার এমন অবিশ্বাস্য রূপ ইউরোপের অনেক নামীদামি সৈকতেও বিরল।

লেখকর সঙ্গে সুলতান (বামে ) ও মাসুদ (মাঝে)

এই সৈকতের ধারেই হঠাৎ পরিচয় হয় কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে—রাফি ভাই, মাসুদ ভাই ও সুলতান ভাই। অচেনা শহরে এই চেনা মানুষদের সান্নিধ্য ভ্রমণের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই আড্ডার মাঝেই আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই লারনাকা ক্যাসলে। মধ্যযুগে এই বন্দরনগরীকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে নির্মিত দুর্গটি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্গের গা ঘেঁষেই রয়েছে অটোমান আমলের একটি পুরোনো মসজিদ।

এরপর যাই গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ অব সেইন্ট লাজারুসে। বাইবেলের বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশুখ্রিষ্টের স্পর্শে পুনর্জীবন লাভ করা সেইন্ট লাজারুসকে এখানেই সমাহিত করা হয়েছিল। চার্চের নিপুণ স্থাপত্য এবং ভেতরের আধ্যাত্মিক পরিবেশ যে কাউকেই বিমোহিত করার সামর্থ্য রাখে।

গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ অব সেইন্ট লাজারুসকারুকার্যময় রূপার বাক্সে সেইন্ট লাজারুসের মাথার খুলি ও হাড়ের অংশবিশেষ রাখা হয়েছে

সুলতান ভাইয়ের পরিচিত এক সিপ্রিয়ট রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিতে গিয়ে লারনাকার স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আরও অনেক অজানা তথ্য জানতে পারি। রেস্টুরেন্টের মালিকের সঙ্গে কথায় কথায় গ্রিস আর সাইপ্রাসের মানুষদের জাতিগত পার্থক্যের এক চমৎকার ইতিহাস উঠে আসে। আনাতোলিয়ান বা হেলেনিক গ্রিকদের তুলনায় সিপ্রিয়ট গ্রিকরা আর্থিকভাবে অনেক বেশি সচ্ছল ও অতিথিপরায়ণ।

লারনাকার মানুষদের প্রাত্যহিক জীবনে ভূমধ্যসাগরীয় এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। তারা কোনোভাবেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্ধের মতো ছুটতে রাজি নন। গ্রিকদের ‘সিগা সিগা’ বা ধীরে চলো নীতিই মূলত তাঁদের জীবনের প্রধান মন্ত্র। বিকেল গড়াতেই সমুদ্রের ধারের ক্যাফেগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

পূর্ব ভূ-মধ্যসাগর তীরের শহর লারনাকায় দাঁড়িয়ে আছে এই দুর্গ

বয়োজ্যেষ্ঠরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ঐতিহ্যবাহী ‘তাভলি’ বা ব্যাকগ্যামন খেলায় মেতে ওঠেন, সঙ্গে থাকে ধোঁয়া ওঠা সিপ্রিয়ট কফি অথবা বরফ শীতল ফ্রাপে। তরুণ প্রজন্ম আবার পার্টি আর আড্ডায় বেশি মেতে থাকে। কাজের চেয়ে তারা পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর সামাজিকতা রক্ষায় অধিক মনোযোগী। রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়াদাওয়া করা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সপ্তাহে অন্তত কয়েক দিন তাদের অনেকের বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না। এত প্রাচুর্য আর মৎস্য রপ্তানিতে দারুণ সুনাম থাকলেও, আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখানকার মানুষ মাছের চেয়ে মাংস বা অন্যান্য খাবারেই বেশি তৃপ্তি খোঁজেন। এই আলস্য মোড়ানো, ধীরস্থির জীবনযাপন লারনাকাকে এক অন্য রকম স্নিগ্ধতা দিয়েছে, যা ইউরোপের অন্যান্য ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতা থেকে পুরোপুরি আলাদা।

সারা দিনের ঘোরাঘুরি শেষে রাতে সুলতান ভাইয়ের বাসায় যখন দেশি স্বাদের গরুর মাংস, ডাল আর গরম ভাতের দেখা পেলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল ভূমধ্যসাগরের তীরে বসেই বাংলাদেশের চিরচেনা স্বাদ আস্বাদন করছি। স্লোভেনিয়ার মতো দেশে যেখানে বাঙালি খাবারের দেখা মেলাই ভার, সেখানে এই আতিথেয়তা ছিল পরম আরাধ্য। রাতের বেলায় লারনাকার পুরোনো বাড়িগুলোর দিকে তাকালে স্থাপত্যের ভূমধ্যসাগরীয় এক নিজস্ব ধারা চোখে পড়ে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির দেয়াল সাদা অথবা আসমানি রঙের, যা সাগরের নীল জলের সঙ্গে এক দারুণ মেলবন্ধন তৈরি করে। রাস্তার ধারে অযত্নে বেড়ে ওঠা লেবু, কমলা আর জলপাইগাছগুলো শহরকে নান্দনিক আবহে মুড়িয়ে রেখেছে। অতিরিক্ত টক হওয়ায় স্থানীয় লোকজন রাস্তার ধারের এই ফলগুলো খায় না ঠিকই, কিন্তু চোখের তৃপ্তি মেটাতে এদের জুড়ি নেই।

পরদিন সকালে মেরিনা বে-র সামনে দাঁড়িয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে দেখছিলাম নীল জলের বুকে ভাসমান মাছ ধরার সারি সারি নৌকা। গ্লোরিয়া জিনসে বসে আলাপ হলো হাঙ্গেরি থেকে আসা কর্মী ইভার সঙ্গে। পূর্ব ইউরোপের স্থলবেষ্টিত দেশের তুলনায় সাইপ্রাসের আয় ভালো, আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এখানকার পরিচ্ছন্ন, দূষণমুক্ত সমুদ্র। কেবল সাগরের অমোঘ টানেই ইভা লারনাকায় পাড়ি জমিয়েছেন। ইভার চোখেমুখে যে প্রশান্তি দেখেছি, তাতেই স্পষ্ট বোঝা যায় লারনাকা কতটা সহজে মানুষকে আপন করে নিতে পারে। দারুণ মুগ্ধতা আর নীল জলের হাতছানি পেছনে ফেলে নিকোশিয়ার বাসে চেপে বসে উপলব্ধি করি, এই ছোট শহরটি কেবল কোনো গন্তব্য নয়, এটি ইতিহাস, প্রকৃতি আর মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তায় ভরা অনবদ্য এক গল্প।

লেখক: ছাত্র

ছবি: লেখক

Read full story at source