ইমরানবিহীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা—নতুন করে পাকিস্তান-আফগানিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
· Prothom Alo

পাকিস্তানের রাজনীতি যে বর্তমানে ঢিলেঢালা অবস্থায় রয়েছে, তা বলার বাকি রাখে না। ইমরান খানের অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের গণতন্ত্র যেমন ভঙ্গুর, তেমনি দিনে দিনে তা এক প্রক্সি ‘সেনাশাসন’–এর বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলছে। গত মাসেই দেখা গেল, জেলে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা বেগতিক। বিশেষ করে তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি অনেকটাই কমে গেছে। তা ছাড়া আরও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা তো আছেই। ইমরান খানের দল ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, ইমরান খানের করুণ শারীরিক অবস্থার জন্য পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের গাফিলতি দায়ী। এ ছাড়া ইমরান খানকে জেলে দেখতে যাওয়া নিয়ে তাঁর পুত্র, বোন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বাধা দেওয়ার কথা বেশ কয়েকবার গণমাধ্যমে চড়াও হয়েছে।
বলা বাহুল্য, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইমরান খানের সুচিকিৎসার দাবিতে ১৪ জন সাবেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়ক পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে চিঠি দিয়েছেন। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, মাইকেল আথারটনের মতো বিখ্যাত অধিনায়কেরা। এমতাবস্থায় পাকিস্তান সরকারের গাফিলতির কথা কিছুটা হলেও চোখে পড়ার মতো।
Visit moryak.biz for more information.
পাকিস্তানে এখনো ইমরান খানের ৫০ থেকে ৬০ ভাগের মতো জনসমর্থন রয়েছে বলে দাবি করেন অনেকেই। কিন্তু ২০২২ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর ইমরান খান ও তাঁর দল পিটিআইয়ের ওপর অধিক বল প্রয়োগ দেখা গেছে। ফলস্বরূপ আজ ইমরান খান কারাবাস ভোগ করছেন ও তাঁর দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে। বাস্তবিকভাবেও ফুটে উঠেছে বারবার কেমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ হয়েছে ইমরান ও তাঁর দলের ওপর, যা স্বীকার করেছেন অনেক বিশ্লেষকই। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নিবন্ধন বাতিল হওয়া সত্ত্বেও ইমরানের দলের নেতৃবৃন্দ স্বতন্ত্র হয়ে অংশ নেয়। এ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অধিকাংশই বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে গেলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। সরকার গঠন করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির জোট ‘ঐতিহাসিক জোট’, যা ছিল একদমই অকল্পনীয়। তবে এ সরকার গঠনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ, তা দিনে দিনে আরও জোরালো হচ্ছে। পাশাপাশি শেষ মুহূর্তে বেশ কয়েকটি আসনের নির্বাচনের ফলাফল কারচুপিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ তো আছেই।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
বিশ্লেষকদের দাবি, ইমরান খানের সরকার পতনের সময় থেকে সাধারণ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, জোট সরকার গঠন ও শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী বানানো—সবই সম্পন্ন হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের বদৌলতে। সেই থেকে গেল দুই বছরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিকাংশ কর্মকাণ্ডই প্রশ্নবিদ্ধ করছে পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে।
উদাহরণস্বরূপ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে কয়েকবার আন্দোলনের ডাকে তাঁর সমর্থকদের বিক্ষোভে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ন্যক্কারজনক হামলা করেছে, যা কিছু হতাহতের ঘটনাও ঘটিয়েছে। এ জন্য পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরীণ ক্রীড়নকরূপে কাজ করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী—এমন দাবি অনেক বিশ্লেষকেরই। বাস্তবে সেনাবাহিনীকে আকস্মিকভাবে অধিক বরাদ্দ ও বিপুল সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে শাহবাজ শরিফের জোট সরকারও। যা পাকিস্তানের বর্তমান সরকারকে সেনাবাহিনীর ‘পুতুল’ বলার অভিযোগকে আরও জোরালো করছে। সাধারণ জনগণের মধ্যে অনেকেই এ ব্যাপারে বাস্তবতা উপলব্ধি করছেন এমন কথাও উঠে আসছে বিভিন্ন বিশ্লেষকের প্রতিবেদনে।
পাকিস্তানে তাই একপ্রকার সেনাসমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রণ চলছে—এমন এক সাধারণ মন্তব্যই করছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, যা পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে বাস্তবে এক কঠিন অবস্থায় ফেলছে দিনে দিনে।
গত রমজান মাসেই নতুন করে দেখা গেল, আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা। আফগানিস্তানে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বোমা হামলায় অনেক নিরীহ মানুষের হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। আর সীমান্তে সেনাবাহিনীও হামলা করে দিনে দিনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে আফগানিস্তানে। দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা যেন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। আফগান প্রশাসনের দাবি, পাকিস্তানই প্রথমে তাদের ওপর হামলা করেছে। পাকিস্তানও হামলার কারণ হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তার অজুহাত দিচ্ছে। কিন্তু তাদের বর্বরতার বলি হয়েছে কয়েক শ আফগান বেসামরিক নাগরিক।
এ জন্য বিশ্লেষকেরা পাকিস্তানের দুর্বল জোট সরকারের বর্তমান ভূরাজনৈতিক ভূমিকাকে যেমন দায়ী করে, তেমনি সেনাবাহিনীর নগ্ন হস্তক্ষেপকেও কারণ হিসেবে দাবি করে। অবশ্য কার্যকর বিরোধী দল না থাকা ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নীরব ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। তা ছাড়া দেশ চালাতে বর্তমান জোট সরকারের পলিসিও বেশ দুর্বল, এমন অভিযোগও করেন অনেকে। বেলুচিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যাপক সমালোচনা ও ভঙ্গুর জোট সরকারের অপশাসনের সমালোচনা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন প্রদেশ ও জেলায় এমন সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ছে। ইমরান খানের দলের ওপর দমনপীড়ন যেভাবে চলমান রয়েছে, সে জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ পাকিস্তানে গণতন্ত্রকে অনেকটা অকার্যকরও বলছে। তাদের মতে, বিরোধী দল হিসেবে ইমরানের দলের সক্রিয় কার্যক্রম বারবার বাধার সম্মুখীন হওয়া ও অন্যান্য দলের নীরব ভূমিকাই পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে।
তা ছাড়া দেশটিতে কয়েক বছর ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা না থাকারও সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। অনেকের মতে, ইমরান খান তাঁর আমলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এবং ভূরাজনৈতিক বিষয় ব্যালেন্স করে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে যেভাবে দেশ চালিয়েছে, শাহবাজ শরিফের বর্তমান জোট সরকার সেসব ব্যাপারে দিনে দিনে বেশ অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। এর বড় কারণ হিসেবে রয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ। অনেকেই মনে করেন, এভাবে চলতে থাকলে পাকিস্তান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ ক্ষতির শিকার হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে। যা সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে পাকিস্তানের চলমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট এভাবে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে অস্থিতিশীলতা, ধীরে ধীরে অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে দেশটিতে। আর তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে পাকিস্তানের জনগণের ওপর।
তাইতো গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা রক্ষায় পাকিস্তানের কথিত সেনাসমর্থিত বর্তমান সরকারের কার্যক্রমগুলোর ব্যাপারে পাকিস্তানের জনগণের সচেতনতা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উভয় প্রভাব রাখার বিকল্প নেই।
একজন লেখক হিসেবে অনেকের মতোই পাকিস্তান সরকারের কাছে একান্ত অনুরোধ থাকবে, ইমরান খানের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে যেন কোনো গাফিলতি না করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মিথ্যা মামলা নিষ্পত্তি করে যেন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ইমরান ও তাঁর দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম যেন স্বাভাবিকভাবে হতে পারে অদূর ভবিষ্যতে—সেই আশা ব্যক্ত করছি। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ইমরানের গুরুত্ব অপরিসীম এখনো।
লেখক: তাওহীদ জানান অভিক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়