ইরান যুদ্ধে চীনের চুপ থাকার রহস্য কী
· Prothom Alo
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনটি বিশ্বরাজনীতিতে ‘জঙ্গল আইন’ বা গায়ের জোরের শাসন ফেরার দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দিনটিতে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া ক্ষেপণাস্ত্র আর বোমায় ইরানে নেমে আসে বিভীষিকা।
আলোচনার আড়ালে শত্রুপক্ষকে অপ্রস্তুত রেখে আক্রমণ করার কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য নতুন কিছু নয়। এবারের হামলাটিও ইরানকে একইভাবে হতভম্ব করে দেয়। অতর্কিত এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেসিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিহত হন। তবে হামলাকারীরা যে শাসনব্যবস্থার পতনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ হয়নি। ইরান ক্ষতবিক্ষত হলেও দেশটির সরকার টিকে আছে।
Visit moryak.biz for more information.
আক্রমণের জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সামনে তা নগণ্য; বরং এরপর মার্কিন হামলার তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে ১০ মার্চ ইরান ইতিহাসের অন্যতম বড় হামলার শিকার হয়। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকে। এমতাবস্থায় বিদেশি সাহায্য ছাড়া তেহরানের টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এমন দুঃসময়ে রাশিয়ার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় ইরান চীনের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে ছিল। কারণ, কেবল চীনেরই সামর্থ্য আছে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার। কিন্তু বেইজিংয়ের আচরণ ছিল বিস্ময়কর রকমের নির্লিপ্ত। হামলার দুই দিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমনভাবে নিয়মিত ব্রিফিং শেষ করছিল, যেন মধ্যপ্রাচ্যে কিছুই ঘটেনি। পরে এক সাংবাদিকের কড়া আপত্তির মুখে চীনা মুখপাত্র মাও নিং অনিচ্ছা সত্ত্বেও মার্কিন হামলার নিন্দা জানান।
চীনের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরি শ্যানডং তাইওয়ানের জলসীমার কাছে মহড়া দিচ্ছে। গতকাল স্থলবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে তাইওয়ান ঘিরে ব্যাপক মহড়া চালায় চীন।স্পষ্টতই চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তলে–তলে কোনো আপস হয়েছে, যেখানে তাইওয়ানকে গুরুত্ব দিয়ে ইরানকে পরিস্থিতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। নিজের দেশে জনপ্রিয়তার ধস ঠেকানো এবং চীনের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তির স্বার্থে ট্রাম্পও কৌশলী হয়ে তাইওয়ানের কাছে কয়েক শ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি পিছিয়ে দিয়েছেন।
পরবর্তী দিনগুলোতে চীন যদিও হামলার কড়া সমালোচনা শুরু করে এবং ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি থেকে বিশ্বকে সরে আসার আহ্বান জানায়। তবু তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম নেয়নি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বড় বড় কথা বললেও ইরানকে কোনো কার্যকর সামরিক সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। চীন বিভিন্ন প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করলেও তারা ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে মাঠে নামার কোনো আগ্রহই দেখায়নি।
চীন তখনো নির্বিকার ছিল, যখন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দেয়। উল্লেখ্য যে চীনের আমদানি করা তেলের বিশাল একটি অংশ এই পথেই যাতায়াত করে। বেইজিং কোনো কঠোর অবস্থান না নিয়ে কেবল শান্তি ও আলোচনার কথা বলতে থাকে। চীনের এই অদ্ভুত নীরবতা বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে এর পেছনের কারণ খুবই পরিষ্কার। ইরানের সংকটের চেয়ে বেইজিংয়ের কাছে নিজের দেশ এবং তাইওয়ান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের ওপর হামলা শুরু হওয়ার এক মাস আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে দীর্ঘ ফোনালাপ হয়েছিল। চীন এই ফোনালাপের সারসংক্ষেপে ইরানের উত্তেজনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তাদের প্রধান মনোযোগ ছিল চীন-মার্কিন বাণিজ্য এবং তাইওয়ান ইস্যু। চিন পিং তাইওয়ান নিয়ে নিজের লাল রেখার কথা স্পষ্টভাবে ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। জবাবে ট্রাম্পও চীনের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
স্পষ্টতই চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তলে–তলে কোনো আপস হয়েছে, যেখানে তাইওয়ানকে গুরুত্ব দিয়ে ইরানকে পরিস্থিতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। নিজের দেশে জনপ্রিয়তার ধস ঠেকানো এবং চীনের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তির স্বার্থে ট্রাম্পও কৌশলী হয়ে তাইওয়ানের কাছে কয়েক শ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি পিছিয়ে দিয়েছেন। চীন বর্তমানের এই শান্ত পরিস্থিতি বজায় রাখার বিনিময়ে ইরানের মতো একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্রকে ত্যাগ করতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি।
ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জের’ চেষ্টা যেভাবে উন্মোচিত হলোবেইজিং মনে করছে, ইরান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত তাদের অর্থনীতিতে বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা দেবে না। যুক্তরাষ্ট্র নিজ সীমানার বাইরে খুব বেশি জড়িয়ে পড়তে চায় না। তাই তারা ইরানে হয়তো স্থলযুদ্ধ শুরু করবে না। স্থল অভিযান ছাড়া শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো অসম্ভব বলে চীনের বিশ্বাস। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে চীনের বিশাল মজুত ভান্ডার কয়েক মাস তাদের অভাব সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
অন্য এক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে অনেক বিশ্লেষক বলছেন যে যদি তেহরানে মার্কিন–সমর্থিত নতুন কোনো সরকারও আসে, তবু তাদের চীনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। কারণ, ইরানের তেল এবং গ্যাসের প্রধান ক্রেতা হলো চীন। যে সরকারই আসুক না কেন, দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে চীনের বিনিয়োগ তাদের লাগবেই। বেইজিং মনে করে, তখন বরং নিষেধাজ্ঞা ছাড়া ইরানের সঙ্গে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে বাণিজ্য করা সম্ভব হবে।
ইরান ইস্যুতে চীনের এই নীরব থাকা দেশটিকে একটি বড় বিশ্বশক্তি হিসেবে কিছুটা নৈতিক পরাজয়ের মুখেই দাঁড় করিয়েছে। মুখে গায়ের জোরের রাজনীতির বিরুদ্ধে বললেও চীনের এই কৌশলী পশ্চাদপসরণ একটি চিরন্তন সত্যকেই পুনরায় সামনে এনেছে। স্বার্থের সামনে নীতির বিসর্জন আজও বিশ্বের অমোঘ বাস্তব। আর ক্ষমতার অসমযুদ্ধে নীতি নয়; বরং শক্তিশালীর ইচ্ছা এবং নিজের স্বার্থই শেষ কথা বলে।
ইয়ার শিয়াওমি গবেষক সাংহাইয়ের হোরাইজন ইনসাইট সেন্টার
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত