লিটন নান্নুর নতুন পার্টি
· Prothom Alo

গালে হাত দিয়ে দৌড়াচ্ছে লিটন। একটু আগেই গালে জোরালো ঘুষি খেয়ে চোয়াল নড়ে গেছে। বেশ কিছুটা দূরে ধুপধাপ করে দৌড়ে আসছে তার বন্ধু নান্নু। একটু পরপর পেছনে তাকাচ্ছে দুজন। লোকজন কি তাড়া করছে এখনো? ধরা পড়লে গণপিটুনি খেতে হবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ওদের।
লিটন আর নান্নুকে আপনাদের চেনার কথা না। দুজনই ছিনতাইকারী। কিন্তু নিজেদের পেশায় একেবারেই নাম করতে পারেনি তারা। ছিনতাই করতে গিয়েই মারটা খেয়েছে লিটন। বিশালদেহী হওয়ায় ধাক্কাটাক্কা দিয়ে কোনোমতে বেঁচে গেছে নান্নু। শেষমেশ নিরাপদ এলাকায় এসে থামল দুজন। রিপনের চায়ের দোকানে বসে নান্নু লিটনকে বলল, ‘তোর কপালডা ভালো রে।’
Visit fish-roadgame.com for more information.
ঠান্ডা পানির একটা বোতল কপালে ঘষছিল লিটন। নান্নুর কথা শুনে কপাল থেকে বোতলটা সরাল। কপালের এক পাশ ফুলে আলু হয়ে গেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিটন আবার কপালে রাখল বোতলটা।
‘কেমনে?’
‘দৌড়ানির চেয়ে মাইর খাওয়া ভালো,’ এখনো হাঁপাচ্ছে নান্নু। ‘এই শইল... নিয়া...দৌড়ানো চাপ!’ তার বিশাল ভুঁড়িটা ওঠানামা করছে দ্রুত।
লিটন জবাব না দিয়ে কপালের ফোলা অংশটা দেখাল নান্নুকে। একটু ঝুঁকে হাত দিয়ে কপালটা পরখ করে চুকচুক শব্দ করল নান্নু।
‘এহ, নিজের দোষেই মাইরটা খাইলি। কামের সময় তোর মোবাইল গুঁতানো লাগব ক্যান?’
৮৬ বছর বয়সী দড়াবাজজবাব দিতে পারল না লিটন। অন্ধকার গলিতে একটা মুরগি পেয়েছিল ওরা। লোকটা যে পয়সাওয়ালা, দেখেই বুঝেছিল লিটন। গলিতে ঢুকতেই লোকটাকে আটকাল ওরা। ছুরি হাতে দাঁড়াল লিটন। পাশ থেকে হুংকার দিল নান্নু—‘যা আছে বাইর কর!’ (এসব ক্ষেত্রে নার্ভাস হয়ে লিটন তোতলায় বলে ভয়েসওভারটা নান্নুই দেয়)। চমকে উঠল লোকটা। মুখ সাদা হয়ে গেল ভয়ে। মোবাইল, মানিব্যাগ নান্নুর হাতে দিয়ে বলল, ‘জুতার ভেতর আরও টাকা লুকানো আছে, দেব?’
‘দেন...ধুরো। দে,’ ধমক দিল নান্নু।
লোকটা ঝুঁকে জুতা খুলতে শুরু করল। সময় নিচ্ছিল বেশি, বিরক্ত হয়ে লিটন পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও দেখতে শুরু করল। কতক্ষণ দেখেছে টেরই পায়নি, হঠাৎ প্রচণ্ড এক লাথি খেয়ে হাত থেকে ছুরিটা পড়ে গেল। তারপর ধামাধাম কয়েকটা ঘুষি খেল মুখে, কপালে। লোকটা যে এই বুদ্ধি করেছে, কে জানত! কোত্থেকে লোকজন ছুটে এল। ভয় পেয়ে মোবাইল-মানিব্যাগ ফেলে দৌড় দিল নান্নু। সামলে নিয়ে দৌড় শুরু করল লিটনও।
‘শালার এই রিলের নেশা ছাড়তেই পারতেসি না,’ আক্ষেপ করে বলল লিটন। ‘কিন্তু তুই ব্যাটা কী করলি? লোকটা যে এই ফন্দি করসে, খেয়াল করবি না? তুই কী করতাসিলি?’
‘আমিও রিল দেখতাসিলাম। ভাবলাম, দেখি হালায় কী কী ভিডিও দেখে...ছি ছি ছি...যা-তা।’
‘অন্যের ফোন ঘাঁটা ঠিক না। প্রাইভেট জিনিস।’
‘কথা অবশ্য ঠিকই কইসোস। আঁতকা মাইর দেওয়ায় ডরে ফোনটোন ফালাইয়া দৌড় দিসি।’
‘তার থেইকা বড় কথা, চাকুটাও থুইয়া আইসি। পুরা লস প্রজেক্ট। এখন ছিনতাই করুম কেমনে? খামু কী?’
পাশ থেকে কে যেন বলল, ‘তোরা যে ছিনতাই করস, লজ্জা লাগে না?’
‘ক্যান? লজ্জা লাগব ক্যান? ভিক্ষা করি নাকি? খাইট্টা খাই,’ রেগে জবাব দিল নান্নু। ‘আপনে কেডা?’ ফোনের টর্চ জ্বেলে দেখার চেষ্টা করল লোকটা কে। মাঝবয়সী একজন লোক। চায়ের কাপের গভীরে পড়ে থাকা আদা আঙুল দিয়ে বের করে খাচ্ছে।
‘শোন, তোরা এই কাজ ছাড়,’ বলল লোকটা। ‘এই বেরেন দিয়া ছিনতাই হইব না। আমার লগে আয়। কাম দিমু। ভালো ইনকাম।’
‘কামটা কী?’
‘আমার পার্টির মেম্বার হবি।’
‘দেখেন’...কপালে বোতল ঠেকিয়েই উঠে দাঁড়াল লিটন। উত্তেজিত হয়ে গেছে সে। ‘আমরা ছিনতাইকারী হইতে পারি, কিন্তু আমগো একটা নীতি আছে। কোনো পলিটিকসের মধ্যে আমরা নাই। আর আপনি তুই তোকারি করেন কেন? আমরা সিনিয়র ছিনতাইকারী।’
‘আরে, গরম হইয়ো না। এই পার্টি ওই পার্টি না। এটা হইল অজ্ঞান পার্টি। নীতি আমারও আছে। আমি জ্ঞান থাকা মানুষের কাছ থেইকা কিছু নেই না। একটা মানুষ অজ্ঞান, তার জিনিসপত্র নিজের হেফাজতে রাখা তো আমার দায়িত্ব, নাকি?’
‘তারে অজ্ঞান তো আপনেই করসেন।’
‘এটা তো পেশাগত কারণে করতে হইতাসে। ক্যান, অপারেশনের আগে ডাক্তার কি রোগীরে অজ্ঞান করে না?’
‘করে।’
‘আমিও তো অজ্ঞানই করতাসি। আমারটাও একরকমের অপারেশন বলতে পারো। খালি পেলেসটা মনে করো আলাদা। আমি বাসে, লঞ্চে, রাস্তাঘাটে কামডা করি।’
‘তো কন, আমগো দরকার ক্যান?’
‘ঈদের টাইম তো, লোকবল কম। সাপ্লাই দিয়া কুলাইতে পারতাসি না। রানিং লোক দরকার। তোমরা রাজি থাকলে কও, হালকা একটা ট্রেনিং দিয়া ফিল্ডে নামায় দেই।’
‘আপনার লাভ?’
‘ওই যে, কমিশন। যা কামাইবা, তার ২০ পারসেন্ট আমার।’
নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি হলো লিটন-নান্নুর। তারা রাজি।
ট্রেনিং শেষে অপারেশনে এসেছে লিটন-নান্নু। নান্নুর পকেটে রুমাল। এই রুমাল নাকে চেপে ধরলে যে কেউ জ্ঞান হারাবে। পকেট ক্লিয়ার করবে লিটন—এটাই প্ল্যান। জানালার পাশের সিটে বসেছে নান্নু। তার পেছনের সিটে বাঁ পাশে লিটন। মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় দুজনই। বাস হাইওয়েতে উঠতেই হঠাৎ চিৎকার করে উঠল নান্নুর পাশে বসা লোকটা। ঘটনা কী? চমকে উঠল লিটন।
‘কী হইসে ভাই?’
‘আরে, এই লোক তো ফিট হইয়া গেছে! কী সর্বনাশ! মনে হইল হঠাৎ পাহাড়ধস...।’
লিটন তাকিয়ে দেখল, নান্নু অজ্ঞান হয়ে পাশের যাত্রীর ওপর ঢলে পড়েছে। সামনে একটা ক্লিনিক খুঁজে বাস থামানো হলো। বাসের কয়েকজন যাত্রী মিলে কোনোমতে ধরে নামাল নান্নুকে। লিটনের জিম্মায় নান্নুকে রেখে বাকিরা আবার ফিরে গেল বাসে। কয়েক ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরল নান্নুর।
‘কিরে, কেসটা কী?’ জিজ্ঞেস করল লিটন।
‘আর কইস না, যে ধুলা, হঠাৎ হাঁচি আইলো। পকেট থেইকা রুমালটা বাইর কইরা হাঁচি দিসি...তারপর আর কিছু মনে নাই।’ লিটনের হাত থেকে বোতল নিয়ে পানি খেল নান্নু।
‘কোন পকেট থেইকা রুমাল নিসোস? ডান পকেট না বাম পকেট?’
‘ডান পকেট।’
‘হালা বলদ, ওইটার মধ্যেই তো অজ্ঞান করার কেমিক্যাল দেয়া আছিল!’ হতাশ হয়ে কপাল চাপড়ে ব্যথায় মুখ বিকৃত করে ফেলল লিটন। কপালের ফোলা এখনো কমেনি। নান্নু আবার জ্ঞান হারাচ্ছে। লিটন টের পেল, ইমার্জেন্সির কথা ভেবে পানির বোতলেও অজ্ঞান করার কেমিক্যাল রেখেছিল। ওটাই খেয়েছে নান্নু গাধাটা। হায় রে গাধা!