আফরান নিশো জেদ ধরে বললেন, ‘শুটিং চলবে’

· Prothom Alo

একটি সিনেমার জন্ম শুধু স্ক্রিপ্ট বা ক্যামেরার ফ্রেমে হয় না, এর জন্ম হয় পরিচালক ও পুরো টিমের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অদম্য জিদ থেকে। আমার নতুন সিনেমা দম-এর ক্ষেত্রে এ কথা বর্ণে বর্ণে সত্যি। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, কাজাখস্তানের সেই হাড়কাঁপানো শীত আর দুর্গম পাহাড়ের কথা মনে পড়লে শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে।

দমের গল্প ও কাজাখস্তান যাত্রা

শুটিং লোকেশনের বসে চিত্রনাট্য পড়ছেন নিশো

আমাদের গল্পের মূল ভিত্তি একটি সত্য ঘটনা, যা প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটি একজন মানুষের, যিনি আফগানিস্তানের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টানা ৮৪ দিন আটকা পড়েছিলেন এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন। এই টিকে থাকার লড়াই আমাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। কিন্তু আফগানিস্তানে বর্তমান তালেবান শাসনের কারণে সেখানে শুটিং করা ছিল অসম্ভব। আমরা হন্যে হয়ে আফগানিস্তানের মতো রুক্ষ ভূপ্রকৃতি খুঁজছিলাম। অবশেষে কাজাখস্তান আমাদের সেই লোকেশন উপহার দিল। যদিও কাজাখস্তান সম্পর্কে আমাদের আগে কোনো ধারণা ছিল না, কিন্তু সিনেমার প্রয়োজনে আমরা অজানাকেই আলিঙ্গন করলাম।

Visit chickenroadslot.pro for more information.

লোকেশনের প্রতিকূলতা

চঞ্চল চৌধুরী ও আফরান নিশোকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন পরিচালক

শুটিংয়ের আগে আমরা যখন ‘রেকি’ করতে যাই, তখনই বুঝতে পারি লড়াই কতটা কঠিন হবে। কাজাখস্তানের আলমাতি শহর থেকে দূরে মাইলের পর মাইল শুধু পাহাড় আর রুক্ষ প্রান্তর। সেখানে বড় বাধা ছিল ভাষা। রাশিয়ার প্রভাব থাকায় ইংরেজি জানা মানুষ নেই বললেই চলে। আমরা ডেলিকা ভ্যানগাড়িতে দিন-রাত এক করে লোকেশন খুঁজেছি। সেখানে হাড়কাঁপানো মাইনাস তাপমাত্রায় শুটিংয়ের প্রস্তুতি নেওয়া ছিল এক অসাধ্য সাধন। আমার টিমের ডিওপি (ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি) মিখাইল সিরিয়ানভ, লাইট ডিজাইনার আইনুরসহ পুরো টেকনিক্যাল টিম যেভাবে ভারী সরঞ্জাম নিয়ে পাহাড় ডিঙিয়েছে, তা দেখে আমি বারবার মুগ্ধ হয়েছি।

নিশোর রূপান্তর ও ত্যাগ

কাজাখস্তানে রনি–নিশো জুটির সঙ্গে ডিওপি মিখাইল (ডানে)

এই সিনেমায় আফরান নিশোর নিবেদন আমাকে অবাক করেছে। চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ওজন কমিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন। এমনকি রেকি করার সময়ও তিনি আমাদের সঙ্গে যেতে চাইলেন, যাতে শুটিংয়ের সময় ওখানকার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। শুটিং শুরু হলে কাজাখস্তানের কনকনে শীতে যখন আমরা সবাই মোটা জ্যাকেট পরেও টিকতে পারছিলাম না, তখন নিশো চরিত্রের প্রয়োজনে পাতলা পোশাকে শুটিং করেছেন। শুটিং করতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন, পরিচালক হিসেবে আমি সেদিনের শুটিং বাতিল করি, কিন্তু আফরান নিশো জেদ ধরে বলেন, ‘শুটিং চলবে। শুটিং বন্ধ হলে সিনেমার ক্ষতি হবে।’ তাঁর এই অদম্য উৎসাহ দম সিনেমাটিকে প্রাণ দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার রহমত ছিল আমাদের সঙ্গে। তার প্রমাণ আমরা নানাভাবে পেয়েছি।

রুম থেকেই দেখা যাচ্ছিল পিরামিড

পূজা ও চঞ্চলের লড়াই

বালিয়াড়িতে শট দেওয়ার সময় পূজা অসুস্থ হয়ে পড়েন

শুধু নিশো নন, সিনেমায় পূজা চেরী আর চঞ্চল চৌধুরীও তাঁদের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। মরুভূমির উঁচু বালিয়াড়িতে (ডুন) একটি শট দেওয়ার সময় পূজা অসুস্থ হয়ে পড়েন। উঁচু জায়গাতে অক্সিজেন কম থাকায় তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তার ওপর ছিল উচ্চতাভীতি। একপর্যায়ে আমাদের ওয়াকিটকিও কাজ করছিল না, তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

কিন্তু পূজা দমে যাননি, তিনি ওই পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেই শট শেষ করেছেন। অন্যদিকে চঞ্চল ভাই কাজাখস্তানে এসেই প্রথম কয়েক দিন ওখানকার পরিবেশ দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুরো টিমের স্পিরিট দেখে চঞ্চল চৌধুরী যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন, তা কেবল একজন বড় মাপের শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।

অপ্রত্যাশিত বাধা ও প্রকৃতির কৃপা

শুটিং এর ফাঁকে গরম কাপড় জড়িয়ে পূজা চেরী

শুটিংয়ের সময় আমরা বারবারই প্রকৃতির বাধার মুখে পড়েছি। কখনো দিনের আলোর স্বল্পতা, কখনো প্রচণ্ড ঠান্ডায় ক্যামেরার লেন্স জমে যাওয়া—সবই ছিল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। তবে আমাদের বিশ্বাস ছিল, আমরা যদি সৎভাবে চেষ্টা করি, অবশ্যই উতরাতে পারব। অনেক কঠিন মুহূর্তেও দেখা গেছে হঠাৎই আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে চলে এসেছে। অপরিচিত একটি পরিবেশে গিয়ে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় জনমানবহীন প্রান্তরে কাজ করাটা ছিল এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

শেষ কথা

দম কেবল বাংলাদেশের কোনো সিনেমা নয়, আমার কাছে এটি একটি বিশ্বজনীন বা ইউনিভার্সাল গল্প। টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা আর মানুষের সাহসের গল্প, পৃথিবীর সব দেশের মানুষের জন্য সমান। সিনেমাটির টিজার মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকদের যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে আমাদের সব কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে। এই ঈদে সিনেমাটি যখন বড় পর্দায় আসবে, আমি আশা করি, দর্শকেরা বুঝতে পারবেন কেন আমরা কাজাখস্তানের সেই প্রতিকূলতাকে বেছে নিয়েছিলাম।

মঙ্গোলিয়ায় বেড়াতে গিয়ে কেমন অভিজ্ঞতা হলো সাবেক টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লিনুর

Read full story at source