পৃথিবীর দিকে এখন তাকালে এলিয়েনরা কি ডাইনোসর যুগ দেখবে
· Prothom Alo

রাতের তারাভরা আকাশের দিকে তাকালে তোমার মনে কি অদ্ভুত কোনো প্রশ্ন জাগে? যেমন ধরো, মহাবিশ্বের বিশালতা, ছায়াপথগুলোর ধাক্কাধাক্কি কিংবা ব্ল্যাকহোল নিয়ে হয়তো তুমি অনেক ভেবেছ। কিন্তু ডেভিড এরিকসন নামে একজনের মাথায় এসেছে এক বিচিত্র প্রশ্ন। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, ভিনগ্রহ থেকে কোনো এলিয়েন যদি আমাদের পৃথিবীর দিকে তাকায়, তবে আলোর গতির কারণে সে কি ডাইনোসরদের পৃথিবী, মানে অতীতের পৃথিবী দেখতে পাবে? এই চমৎকার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন একজন বিশেষজ্ঞ। সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের সেই প্রশ্নের উত্তর তোমাদের জন্য তুলে ধরছি।
পৃথিবী থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে যদি কোনো এলিয়েন বা ভিনগ্রহী প্রাণী থাকে, তবে পৃথিবীর ডাইনোসরদের দেখতে হলে তাদের ঠিক কত বড় একটা টেলিস্কোপ বানাতে হবে জানো? জানি প্রশ্নটা শুনে তোমাদের হাসি পেয়েছে। কারণ, আমরা এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে কোথাও প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারা আবার বানাবে টেলিস্কোপ! ভাবনাটা হয়তো তোমাদের সে রকমই। তবু বলি, এর পেছনের বিজ্ঞানটা কিন্তু দারুণ রোমাঞ্চকর!
Visit aportal.club for more information.
এককথায় তুমি ভাবতে পারো, বিশাল বড় একটা টেলিস্কোপ বানাতে হবে! কিন্তু ঠিক কত বিশাল হতে হবে? তার আগে তোমাদের হয়ে আমিই একটা প্রশ্ন করে দিই। এলিয়েনদের দূরত্ব আমরা কেন ৬ কোটি ৬০ লাখ আলোকবর্ষই ধরে নিলাম? কারণ, আলোর গতি! আলো মহাকাশের ভেতর দিয়ে এক বছরে যে দূরত্ব পার হয়, তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। আমাদের পৃথিবীতে যে বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সেই ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে ঠিক ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে।
জেমস ওয়েবের পর এবার নতুন রোমান স্পেস টেলিস্কোপ তৈরি করেছে নাসাতার মানে, সেই সময়কার পৃথিবীর আলো কেবল আজ গিয়ে পৌঁছাচ্ছে ৬ কোটি ৬০ লাখ আলোকবর্ষ দূরের কোনো এক গ্যালাক্সিতে! সুতরাং, সেখানে থাকা এলিয়েনরা যদি এখন পৃথিবীর দিকে তাকায়, তবে তারা আজকের পৃথিবী দেখবে না, তারা দেখবে ঠিক ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগের পৃথিবীকে! অর্থাৎ, তারা এখন পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়ানো শেষ ডাইনোসরদের দেখতে পাবে! তবে হ্যাঁ, এর জন্য তাদের অসম্ভব শক্তিশালী একটা টেলিস্কোপ বানাতে হবে।
কত দূর থেকে দেখছে এলিয়েনরা
এই মজার প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দুটি ধাপ পার হতে হবে। এক, অত দূর থেকে একটা ডাইনোসরকে দেখতে কতটা ছোট টেলিস্কোপ লাগবে? আর দুই, অত ছোট জিনিস দেখার জন্য কত বড় টেলিস্কোপ লাগবে?
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশের কোনো জিনিসের আকার মাপতে ডিগ্রি বা কোণ ব্যবহার করেন। কারণ, আকাশটাকে আমাদের চারপাশের একটা বিশাল গোলকের মতো মনে হয়। যেমন ধরো, আমাদের চাঁদের আকার হলো ০.৫ ডিগ্রি। দূরত্ব ও আসল আকারের ওপর নির্ভর করে একটা জিনিস কত বড় দেখাবে, তা বের করার জন্য বিজ্ঞানে চমৎকার একটা সূত্র আছে। একে বলে স্মল-অ্যাঙ্গেল অ্যাপ্রক্সিমেশন।
টি–রেক্সের দাঁত ছিল ভয়ংকরধরে নিই, এলিয়েনরা সবার প্রিয় সেই ভয়ংকর মাংসাশী ডাইনোসর টি-রেক্সকে দেখতে চাইছে। একটা টি-রেক্স লম্বায় প্রায় ১০ মিটার হতো। এবার দূরত্বের কথায় আসি। ৬ কোটি ৬০ লাখ আলোকবর্ষ কিন্তু কোনো সাধারণ দূরত্ব নয়! একে মিটারে প্রকাশ করলে দাঁড়ায় ৬.৬ এর পর ২৩টি শূন্য বসালে যত হয়, ঠিক তত মিটার! বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় ৬.৬ × ১০২৩ মিটার।
এবার সেই জাদুর সূত্রে এই মানগুলো বসালে দেখা যায়, অত দূর থেকে একটা ১০ মিটারের টি-রেক্সের আকার হবে মাত্র ১০-২১ ডিগ্রি! অর্থাৎ, এক ডিগ্রিকে এক সেকসটিলিয়ন (একের পর ২১টি শূন্য) ভাগ করলে যত ছোট হয়, ততটা ছোট! বুঝতেই পারছ, এটা কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষুদ্র!
নাসার টেলিস্কোপ খুঁজে পেয়েছে ‘বাসযোগ্য’ এক্সোপ্ল্যানেটজুম করলেই কি সব দেখা যায়
এখন তুমি ভাবতে পারো, ‘আরে, এটা তো কোনো ব্যাপারই না! ক্যামেরার মতো শুধু অনেক বেশি জুম বা ম্যাগনিফাই করলেই তো ডাইনোসরটাকে বড় দেখা যাবে!’
কিন্তু না, ব্যাপারটা এত সহজ নয়! অনেক দূরের খুব ছোট কোনো জিনিসকে আসলে বিন্দুর মতো দেখায়। তুমি যদি একটা ছবিকে শুধু জুম করো, তবে ছবির পিক্সেলগুলোই শুধু বড় হবে, ছবিটা ঝাপসা হয়ে যাবে। একটা বিন্দুর ভেতরে টি-রেক্সকে স্পষ্ট দেখতে হলে তোমার দরকার রেজোল্যুশন।
টেলিস্কোপের এই রেজোল্যুশন নির্ভর করে মূলত এর আয়নার সাইজ বা ব্যাসের ওপর। এর জন্যও ডাওয়েস লিমিট নামে একটা সূত্র আছে। আমরা যেহেতু আগেই টি-রেক্সের ডিগ্রি বা কোণের মাপটা পেয়ে গেছি, তাই এই সূত্রে মান বসিয়ে আমরা টেলিস্কোপের আয়নার মাপটা বের করে ফেলতে পারি।
অঙ্ক কষে দেখা যায়, ডাইনোসর দেখার জন্য এলিয়েনদের যে টেলিস্কোপ লাগবে, তার আয়নার ব্যাস হতে হবে ৩.২–এর পর ১৬টি শূন্য বসালে যত হয়, তত মিটার! মানে প্রায় ৩.৪ আলোকবর্ষ লম্বা একটা আয়না! চিন্তা করতে পারো? এই আয়নার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যেতে আলোরই প্রায় সাড়ে তিন বছর লেগে যাবে! এই আয়নাটা এতই বড় যে আমাদের সৌরজগৎ থেকে আলফা সেন্টাউরি নক্ষত্রের দূরত্বের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ জায়গা দখল করে নেবে এটা!
অসম্ভব নির্মাণকাজ
বলাই বাহুল্য, এত বড় টেলিস্কোপ বানানোর মতো প্রযুক্তি এলিয়েনদের কাছেও থাকার কথা নয়। তারা যদি এটি বানানোর কৌশল জেনেও থাকে, তবু এত কাঁচামাল পাবে কোথায়? টেলিস্কোপের আয়নাটি যদি মাত্র ১ মিলিমিটারও পুরু হয়, তবু এর ওজন হবে পৃথিবীর ওজনের চেয়েও ১০ কোটি গুণ বেশি! এমন একটা আয়না বানাতে হলে হয়তো বিশাল একটা গ্যালাক্সির প্রায় সব গ্রহ ভেঙে গুঁড়িয়ে তারপর সেই মালমসলা দিয়ে আয়না বানাতে হবে!
তবে এলিয়েনরা যদি খুব চালাক হয়, তবে তারা ইন্টারফেরোমিটার নামে একটা দারুণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। একটা বিশাল আয়না না বানিয়ে, অনেকগুলো ছোট ছোট টেলিস্কোপ অনেকটা জায়গাজুড়ে বসিয়ে এই কাজটা করা যায়। অঙ্কের জাদুতে এই ছোট টেলিস্কোপগুলো মিলে একটা বিশাল টেলিস্কোপের মতো রেজোল্যুশন দিতে পারে। কিন্তু এই চালাকি করেও খুব একটা লাভ হবে না! কারণ, এই পদ্ধতিতে গেলেও আয়না বানাতে বিলিয়ন ট্রিলিয়ন টন মালমসলা লাগবে, যা পৃথিবীর মোট ভরের একটা বড় অংশ! ভাবো তো, যে ইঞ্জিনিয়ারকে এই টেলিস্কোপ বানানোর কন্ট্রাক্ট দেওয়া হবে, এই হিসাব শুনে তার মুখের অবস্থা কেমন হবে!
পাঁচটি মাছ উধাওচলন্ত পৃথিবীতে ডাইনোসর খোঁজা
মজার ছলে ধরে নিলাম, এলিয়েনরা কোনোভাবে এমন একটা টেলিস্কোপ বানিয়ে ফেলল। কিন্তু তারপরেও বিপদ শেষ হবে না! এত বিশাল একটা যন্ত্রকে সঠিক দিকে তাক করানোই হবে একটা দুঃসাধ্য কাজ। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মহাবিশ্বের সবকিছুই তো ছুটে চলছে!
ডাইনোসরের পরিষ্কার ছবি তুলতে হলে টেলিস্কোপটাকে বেশ কিছুক্ষণ পৃথিবীর দিকে ফোকাস করে রাখতে হবে। কিন্তু পৃথিবী তো নিজের অক্ষে লাটিমের মতো ঘুরছে, আবার সূর্যের চারপাশেও দৌড়াচ্ছে। ওদিকে সূর্যও গ্যালাক্সির ভেতর ছুটে চলেছে। আবার এলিয়েনদের গ্যালাক্সিটাও স্থির হয়ে বসে নেই! এত বিশাল দূরত্বে এই ছুটে চলাটা খুব সামান্য মনে হলেও, মনে করে দেখো, টি-রেক্সকে এমনিতে কতটা ছোট দেখাচ্ছিল! এত দূর থেকে টেলিস্কোপে ডাইনোসর তো দূরের কথা, আমাদের সূর্যটাকেই ঠিকমতো দেখা যাওয়ার কথা নয়। সবকিছুর এই অবিরাম ছুটে চলার কারণে ছবিটা এমনিতেই ঘোলা হয়ে যাবে।
ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপবিজ্ঞানীদের স্বপ্ন
এতক্ষণ আমরা এলিয়েন ও ডাইনোসর নিয়ে অনেক মজার কল্পনা করলাম। কিন্তু এই কল্পনার সঙ্গে আমাদের বাস্তব পৃথিবীর জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটা গভীর সম্পর্ক আছে।
আমাদের বিজ্ঞানীদের অন্যতম বড় স্বপ্ন হলো, এমন শক্তিশালী টেলিস্কোপ বানানো। সেই টেলিস্কোপ দিয়ে আমরা অন্য নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরা গ্রহগুলোর (এক্সোপ্ল্যানেট) আবহাওয়া, মেঘ বা মহাদেশগুলো স্পষ্ট দেখতে পাব! এই কাজের জন্যও ঠিক ইন্টারফেরোমিটার প্রযুক্তির বিশাল সব টেলিস্কোপ লাগবে।
যেমন ধরো, ১০ আলোকবর্ষ দূরের পৃথিবীর মতো আকারের কোনো গ্রহের মহাদেশগুলো দেখতে চাইলে আমাদের কয়েক শ কিলোমিটার বিস্তৃত একটা টেলিস্কোপের নেটওয়ার্ক বানাতে হবে! হ্যাঁ, এটা খুব কঠিন কাজ, তবে অসম্ভব নয়। হয়তো আর কয়েক দশকের মধ্যেই আমাদের বিজ্ঞানীরা এমন কিছু একটা বানিয়ে চমকে দেবেন!
অন্য কোনো সৌরজগতের একটা গ্রহের বুকে বিশাল সব সাগর ও মহাদেশ দেখতে পাওয়ার অনুভূতিটা কেমন হবে, একবার ভেবে দেখেছ? এটা করার জন্য আমাদের শুধু প্রবল ইচ্ছাশক্তি দরকার, আর সেই সঙ্গে দরকার বুদ্ধি। আর আমাদের তো বুদ্ধির কোনো অভাব নেই! কারণ, আমরা তো আর ডাইনোসর নই, আমরা মানুষ!
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানএই পাঁচ প্রাণী মানুষের মতোই চাকরি করে