ইরানে দ্রুত জয়ের কথা ভাবছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু তাঁর সব হিসাব–নিকাশ পাল্টে যাচ্ছে
· Prothom Alo

বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হিসাব–নিকাশ ছিল এমন যে এই সামরিক অভিযান চালাতে খুব কমসংখ্যক মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি হবে এবং অর্থনীতিতে সামান্যই প্রভাব পড়বে।
Visit chickenroad-game.rodeo for more information.
তবে ইরানে যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতেই ট্রাম্পের সেই ধারণা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে গেছে।
ইতিমধ্যেই ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদেশগুলো হামলার মুখে পড়েছে। শেয়ারবাজার টালমাটাল হয়ে গেছে। গ্যাসের দাম বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার খরচ করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্বিচার বিমান হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এই হামলার জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে তারা তদন্ত করছে। খোদ মার্কিন তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে, এই হামলার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র দায়ী।
এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন স্থল সেনা ইরানের অভ্যন্তরে ঢোকেনি। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সংঘাত হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হবে না।
সাংবাদিকদের হেগসেথ বলেন, ‘আমরা গতি কমাচ্ছি না, বরং আরও বাড়াচ্ছি।’
হেগসেথ আরও বলেন, ‘আজই আরও বোমারু বিমান এবং যুদ্ধবিমান এসে পৌঁছাচ্ছে।’ গত শনিবার থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় আগ্রাসন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ আগ্রাসন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ববর্তী সময়ের ধারাবাহিক সামরিক সাফল্য থেকে সাহস ও আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে ওই সামরিক সাফল্যগুলো দ্রুত এসেছিল।
এর আগে ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করেছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে, ইয়েমেনে হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্দেহজনক মাদকবাহী নৌযান ধ্বংস করেছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ইরাক, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায় বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়েছে।
এসব অভিযান দ্রুতই শেষ করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে, এসব অভিযান সফল ছিল। এতে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি বা অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল খুবই কম।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে আগ্রাসন শুরু করেছে, তা শুধু এমন দ্রুত সময়ের অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে যুদ্ধটা দীর্ঘ হতে পারে।
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদ এবং মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জ্যাসন ক্রো একসময় মার্কিন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ইরাক ও আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞার আলোকে গত বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেই ‘অনন্ত যুদ্ধের পথে’ এগোচ্ছে, যা তিনি সরাসরি দেখেছেন। ট্রাম্প তখন এর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিলেন।
ক্রো বলেন, ‘আবারও সেই লাখো কোটি ডলার খরচ, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি, কয়েক দশকের অন্তহীন সংঘাত, আমার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন, শতাব্দীর এক–চতুর্থাংশ ধরে মার্কিন যুদ্ধ—এসবের দিকেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট গত বুধবার বলেন, ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের দেশের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন ঠিকই। তবে তিনি সরকারবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সত্তাকে সমর্থন করেননি। হামলা শুরু করার পর থেকে ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু ইরানি সরকারকে উৎখাত করার জন্য তাদের অস্ত্র দেওয়ার কোনো পরিকল্পনায় তিনি একমত হননি।
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক গবেষণা সহযোগী জন হফম্যান বলেন, ‘ট্রাম্প এমন এক ব্যক্তি, যিনি কম খরচে চমকপ্রদ বিজয় পছন্দ করেন। প্রশাসন এবং প্রশাসনের আশপাশের লোকজন থেকে যেমনটা শুনেছি, মাদুরোর ঘটনার পর তিনি বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। অনেক দিক থেকে তিনি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করতেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। খরচ ইতিমধ্যেই বাড়ছে।’
হফম্যান ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়া এবং তেলের ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের ঊর্ধ্বগতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
হফম্যান আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকবে।’
মার্কিন চিন্তক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস–এর জ্যেষ্ঠ ফেলো এলিয়ট আব্রামস বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, ইরানের নেতাদের হত্যা ও দেশটির সামরিক সক্ষমতা ভেঙে ফেলার মাধ্যমে অনেক সুবিধা অর্জন করা যাবে।
আব্রামস বলেন, ‘এ পর্যন্ত যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা হলো মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি। তবে আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে লাভ অনেক বেশি হবে। এই শাসকগোষ্ঠী (ইরানের) ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার চেষ্টা করেছে এবং কখনো কখনো সফল হয়েছে।’
ট্রাম্পসহ তিনজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের জন্য কাজ করেছেন আব্রামস। তাঁর মতে, ট্রাম্প যদি স্থলবাহিনী পাঠাতে না পারেন, তবে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি সীমিত থাকতে পারে। তবে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করা গেলে, তা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পএই রিপাবলিকান সমর্থক বলেন, ‘এমনকি যদি শাসকগোষ্ঠীর (ইরানি) অবশিষ্টাংশও ক্ষমতায় থেকে যায়, তাহলেও তাদের কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি থাকবে না, সার্বিকভাবে কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থাকবে না এবং অঞ্চলটিতে ক্ষমতা প্রদর্শনের কোনো সক্ষমতা থাকবে না।’
তবে ক্যাটো ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক গবেষণা সহযোগী জন হফম্যান মনে করেন, ইরানের অবস্থা অস্থিতিশীল থাকলে তা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
হফম্যান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে যদি বিচ্ছিন্নতাবাদী জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করা এবং ইরানে বিভক্তি তৈরি করার পরিকল্পনা থেকে থাকে, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন মাত্রার ছায়া যুদ্ধই সৃষ্টি করবে না, বরং এ জন্য পুরো অঞ্চলকে অবিশ্বাস্য রকমের মাশুল দিতে হবে।
হফম্যান বলেন, সে পরিস্থিতিতে ‘আপনারা সম্ভবত ব্যাপক শরণার্থীপ্রবাহ সম্পর্কে বলবেন, সম্ভবত আলোচনা করবেন, আইএসআইএসের মতো গোষ্ঠীগুলোর জন্য সময় এবং স্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এগুলো হলো সেসব গোষ্ঠী যারা বিশৃঙ্খলার মধ্যে সাফল্য লাভ করে। আপনারা আসলে অশান্তির ঝাঁপি খুলছেন।’