মনোযোগ হোক শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায়

· Prothom Alo

‘শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক বৈঠকটির আয়োজন করে আইআইডি ও প্রথম আলো

‘শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) প্রিয়াঙ্কা গোপ, ববি হাজ্জাজ, ইলিরা দেওয়ান ও সিস্টার শিখা গোমেজ। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে

গত কয়েক দশকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অবকাঠামো ও ভর্তির হারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে; কিন্তু শ্রেণিকক্ষে শেখার মান কাঙ্ক্ষিত নয়। শিক্ষায় প্রধান সমস্যা হচ্ছে শিখন ঘাটতি। প্রাথমিক শেষ করেও বহু শিশু গণিতে মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে ‘শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা এবং দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান’—এই মানবসম্পদ উন্নয়নকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই এখন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার হতে হবে শিখন ফল অর্জনের ওপর। এ জন্য মনোযোগ বাড়াতে হবে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায়। একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইআইডি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক বৈঠকে অংশ নিয়ে শিক্ষক এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনেরা এ কথা বলেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই গোলটেবিল বৈঠক।

অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমাদের ফোকাস থাকবে লার্নিং আউটকাম বেজড এডুকেশন, ক্যারিয়ারভিত্তিক এডুকেশন।’

ববি হাজ্জাজ বলেন, তাঁর বিশ্বাস শিক্ষায় ছোট ছোট পরিবর্তন করলেই দীর্ঘ মেয়াদে অনেক পরিবর্তন পাওয়া যাবে। এই ছোট ছোট তিনটি জায়গা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো শিক্ষাক্রম, শ্রেণিকক্ষ এবং ধারাবাহিকতা। শিক্ষাক্রম যদি ঠিক হয়, শ্রেণিকক্ষ যদি সঠিক হয় এবং এটি যদি ধারাবাহিকভাবে করা যায়, তাহলে শিক্ষায় অনেক পরিবর্তন হবে।

ববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাপ্রাথমিকে গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। ঝরে পড়াও কম। আবার একই সঙ্গে অনেকে না শিখে বের হয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকে গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। ঝরে পড়াও কম। আবার একই সঙ্গে অনেকে না শিখে বের হয়।

কারিগরি শিক্ষায় বড় ধরনের জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী একই সঙ্গে স্পোর্টস, আর্টস, সংস্কৃতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান। তিনি বলেন, বাজেটের আরও বড় অংশ শিক্ষা খাতে দেওয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশে থাকে। এটিকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিজ্ঞা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকসংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে সেগুলোর সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার ইলিরা দেওয়ান। তিনি বলেন, সমতা নয়, সাম্যের ব্যবস্থা করতে হবে।

‘শিক্ষাক্রমে ফোকাস দরকার’

হলিক্রস কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার শিখা গোমেজ বলেন, ‘একটি প্রগতিশীল শিক্ষা আমরা চাই। সে কারণে শিক্ষাক্রমে ফোকাস দরকার। শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও গবেষণার জায়গাটি খুবই জরুরি। শিক্ষক কেন শিক্ষা-বাণিজ্য করছেন? কেন কোচিং করাচ্ছেন, এই বিষয়টিও তলিয়ে দেখা দরকার।’

কাগজে-কলমে উচ্চমাধ্যমিক দুই বছর হলেও ১৫ মাসও পাওয়া যায় না উল্লেখ করে শিখা গোমেজ বলেন, এত ছুটি! নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না।

অধ্যক্ষ শিখা গোমেজ জানান, এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাওয়ার পর তিনি তাঁর শিক্ষার্থী এবং বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সামনে কথা বলার সুযোগ পেলে কী কী বলবে। শিক্ষার্থীরা বলেছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দেশজুড়ে শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান এবং তাত্ত্বিক ক্লাসের পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্লাসগুলো নিশ্চিত করা। তারপর দুর্নীতি বন্ধ করা। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দুর্নীতির কারণে অনেক ভালো প্রকল্প ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলেছে শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া অভিভাবকদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলেছে শিক্ষার্থীরা।

একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে আইআইডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ আহমেদ বলেন, প্রাথমিকে যারা পড়াশোনা শেষ করছে, তাদের অর্ধেকের বেশির মৌলিক দক্ষতা নেই। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের থেকে আরও পিছিয়ে আছে। ১০ বছরের শিশুদের মধ্যে ৩২ শতাংশ পড়তে পারে ও গণিত বোঝে। তার মানে প্রতি ১০ জনের ৭ জন পারছে না।

ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে ২০২৩ সালের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে সাঈদ আহমেদ বলেন, ৩৯ শতাংশ অভিভাবক আর্থিক অসামর্থ্যকে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ১২টি দেশে করা জরিপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি খরচ করা হয় প্রাইভেট টিউটরের পেছনে। জরিপ করার সময় তাঁরা দেখেছিলেন, একটি পরিবারে শিক্ষায় যত ব্যয় হয়, তার অর্ধেকের বেশি খরচ হয় কোচিং ফি ও শিক্ষকের পেছনে।

শিক্ষার গোড়ায় সমস্যা মন্তব্য করে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, সমস্যা ডায়াগনস্টিক না করে হুট করে চমক দেখাতে গেলে আবারও সেই প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন-উদ্যোগের যে একটা চ্যালেঞ্জ, তার মধ্যে পড়ে যেতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সুমেরা আহসান বলেন, শিক্ষা বিষয়ে খাতভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হয়। আর ভালো পরিবর্তনগুলো যেন সরকার পরিবর্তনের পর পরিবর্তন হয়ে না যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেন তিনি।

সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াঙ্কা গোপ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বহু নির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

শিক্ষাঙ্গন দলীয় রাজনীতির অযাচিত প্রভাবমুক্ত হোক

মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক আয়শা জাহান বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত শিক্ষকের সংকট রয়েছে। ভালোবেসে এই পেশায় খুব কম মানুষই আসেন। প্রথমে এই সংকট দূর করা দরকার। আর শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর আগে কমপক্ষে তিন মাস বনিয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির অযাচিত যে প্রভাব রয়েছে, এটা থেকে মুক্ত হওয়া দরকার।

ব্র্যাকের আইইডির প্রোগ্রামের প্রধান সমীর রঞ্জন নাথ বলেন, শিক্ষায় প্রধান সমস্যা হচ্ছে শিখন ঘাটতি। এটি বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে এসেছে। কথা হচ্ছে কীভাবে এ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। এ জন্য মনোযোগ দেওয়া দরকার শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায়।

প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকর, ইউনিসেফের শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ ফাহমিদা শবনম, ইউনেসকোর কর্মসূচি কর্মকর্তা (শিক্ষা) শিরিন আক্তার, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন সামিয়া হক।

Read full story at source