সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্ট: চিরস্থায়ী কল্যাণের চাবিকাঠি

· Prothom Alo

‘সাদাকাহ জারিয়াহ’ কিংবা ‘সাদাকাতুল জারিয়াহ্’ বলতে এমন দান বা সদকাকে বোঝায়, যার কার্যকারিতা কখনো শেষ হয় না। অর্থাৎ পৃথিবী যত দিন টিকে থাকবে, তত দিন পর্যন্ত সদকাকারী ব্যক্তি জীবিত কিংবা মৃত যেকোনো অবস্থায় এর সওয়াব পেতেই থাকবেন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী এটি শুধু একটি দান নয়, বরং আখিরাতের জন্য একধরনের বিনিয়োগ, যেখানে পার্থিব সম্পদ রূপ নেয় চিরস্থায়ী কল্যাণে।

Visit librea.one for more information.

ইসলামে মানুষকে সম্পদের মালিক নয়, বরং আমানতদার হিসেবে দেখা হয়। সেই আমানতের সঠিক ব্যবহারই ইবাদত। একদিকে যেমন ব্যক্তিগত দান-খয়রাত রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে এমন দানব্যবস্থা, যা দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ের জন্য কল্যাণকর।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, যখন মানুষ মারা যায় তখন তাঁর সব নতুন আমল অর্জন স্থগিত হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল ছাড়া—সাদাকাতুল জারিয়াহ্, কিংবা এমন জ্ঞান, যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় কিংবা এমন সন্তান, যে তাঁর জন্য দোয়া করে (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)।

সময়ের পরিবর্তনে আর্থিক লেনদেনের ধরন বদলেছে, কিন্তু দানের তাৎপর্য বদলায়নি। বরং আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইসলামের এই চিরন্তন ধারণাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

সেই ধারাবাহিকতায় সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও পরিকল্পিত উপায়ে যুক্ত হয়েছে ‘সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্ট’। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে জমাকৃত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, মুনাফা অর্জিত হয় এবং সেই মুনাফা উপযুক্ত উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা যায়। ফলে একদিকে ব্যক্তি তাঁর সম্পদ নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় রাখতে পারেন, অন্যদিকে তা হয়ে ওঠে অবিরাম সওয়াবের উৎস।

অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ধারাবাহিক দানের কাঠামো

সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্ট মূলত এমন একটি অ্যাকাউন্ট, যেখানে গ্রাহক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখেন। ব্যাংক শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগে সেই অর্থ ব্যবহার করে মুনাফা অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে মুনাফার একটি অংশ বা সম্পূর্ণ অংশ দান হিসেবে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা যায়। কিন্তু গ্রাহক চাইলে মূলধন অর্থ অক্ষত রেখে কেবল মুনাফা দান করতে পারেন। এভাবে এককালীন দানের পরিবর্তে একটি টেকসই দানব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘ মেয়াদে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখে।

মুনাফা ও দানের ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া

ইসলামি ব্যাংকিং কাঠামোয় মুনাফা অর্জন হয় শরিয়াহসম্মত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে। সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্টে গ্রাহক পূর্বনির্ধারিত চুক্তির ভিত্তিতে মুনাফা বণ্টনের শর্ত নির্ধারণ করেন, দানের অর্থ স্বচ্ছভাবে নির্দিষ্ট ফান্ড বা প্রকল্পে স্থানান্তরিত হয় এবং প্রয়োজনে গ্রাহক দানের খাত নির্বাচন বা পরিবর্তন করতে পারেন।

এই প্রক্রিয়া দানকে করে তোলে পরিকল্পিত, জবাবদিহিমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী। অনেক ব্যাংকই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দানের রিপোর্ট বা আপডেট জানানোর ব্যবস্থাও রেখেছে, যা গ্রাহকের আস্থা বাড়ায়।

সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সাধারণত ব্যয় হয় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, মেধাবী কিন্তু অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্প এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণের মতো বিভিন্ন কার্যক্রমে। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত সওয়াবের বিষয় নয়, বরং একটি সামাজিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার কার্যকর মাধ্যম।

ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ

ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন কেউ নিজের বা প্রিয়জনের নামে এই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির অংশ হিসেবে এটি গ্রহণ করতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি মানবিক প্রকল্পে ধারাবাহিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং সেবায় কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি ইসলামী ব্যাংকিং শাখার মাধ্যমে সাদাকাহ জারিয়াহভিত্তিক সঞ্চয় ও দানব্যবস্থাকে কাঠামোবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। যেখানে গ্রাহকেরা নিজেদের বা প্রিয়জনের স্মরণে অর্থ জমা রাখতে পারেন এবং সেই আমানত থেকে অর্জিত মুনাফা অনুমোদিত দাতব্য সংস্থাগুলোয় প্রদান করা হয়।

প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী বলেন, ‘সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্ট গ্রাহকদের মধ্যে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এটি প্রমাণ করে, মানুষ দানকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং আখিরাতের বিনিয়োগ হিসেবেও দেখছে।’

এম নাজিম এ চৌধুরী আরও বলেন, ‘সাদাকাহ জারিয়াহ অ্যাকাউন্ট একটি ক্যাশ ওয়াকফ মডেল। গ্রাহকের জমাকৃত টাকা চিরস্থায়ীভাবে ব্যাংকে থাকে, আর সেই অর্থ মুদারাবা নীতিতে বিনিয়োগ করা হয়। সংগৃহীত মুনাফা ব্যাংকের সাদাকাহ পুল ফান্ডে যায় এবং অনুমোদিত খাতে দান করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া ব্যাংকের শরিয়াহ কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। তবে গ্রাহক কিছু ক্ষেত্রে নিজ পছন্দ অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাত বেছে নেওয়ার সুযোগ পান।’

প্রাইম ব্যাংক ইতিমধ্যে আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহসানিয়া মিশন ও মাস্তুল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যাতে অর্থ স্বচ্ছভাবে নির্দিষ্ট সময়ে দান করা যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

Read full story at source