খামেনিকে হত্যা: ইরান এখন কোন পথে এগোবে?

· Prothom Alo

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর দেশটি এসে পৌঁছেছে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুহূর্ত।

এখন কী হবে, তা নির্ভর করছে ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরে কারা প্রাধান্য পান, তার ওপর। কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধমূলক অবস্থান নিতে চাইতে পারেন, যদিও তার বাস্তবসম্মত কোনো লক্ষ্য নেই। অন্যদিকে এমনও কেউ থাকতে পারেন, যাঁরা বুঝতে পারছেন যে তাঁদের সময় ফুরিয়ে আসছে এবং এখনই আলোচনার পথ খোঁজার সময়।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

তবে বড় প্রশ্ন হলো, এখান থেকে ইরান কোন পথে এগোবে?

দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাপক দুর্নীতি এবং শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগের সংস্কৃতি দেশটিকে দুর্বল করেছে। কিন্তু কেবল নিষেধাজ্ঞা বা দুর্নীতি নয়, শাসনব্যবস্থার অদক্ষতাও ইরানকে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তবু ইরান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি এবং যার সম্ভাবনা বিপুল।

প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানে উচ্চশিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বিস্তৃত প্রবাসী সমাজও শক্তিশালী। ইরানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশাল, কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসের মজুত এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুত রয়েছে দেশটিতে। এ ছাড়া সোনা, তামাসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ইরান।

আগামী এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ অনেক কিছু স্পষ্ট করে দেবে। খামেনির চারপাশে থাকা কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধের রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারেন এবং ইসরায়েল, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করতে পারেন। আবার তাঁরা বাস্তবতা মেনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেও পারেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়, এখন তাঁরা দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন, পরে হয়তো কঠোর পরিণতির মুখে পড়বেন।

এ কথার অর্থ হলো, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইরানের নেতাদের সামনে এখনো একটি সমঝোতার সুযোগ আছে। যদি তাঁরা সংঘাত না বাড়িয়ে আলোচনা বা ছাড় দেওয়ার পথ বেছে নেন, তাহলে তাঁরা বড় ধরনের হামলা, কঠোর শাস্তি বা শাসনব্যবস্থার পতনের ঝুঁকি এড়াতে পারেন।

কিন্তু যদি তাঁরা এই সুযোগ না নেন এবং আগের মতোই কঠোর অবস্থানে থাকেন বা উত্তেজনা বাড়ান, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে। অর্থাৎ, এখন সিদ্ধান্ত নিলে বাঁচার পথ আছে, পরে হয়তো আর সেই সুযোগ থাকবে না। যদি তাঁরা সমঝোতার পথ বেছে নেনও, ভেতরের ক্ষমতার লড়াই কেবল শুরু হবে। দেশটির ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভূমিকা তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কয়েকটি বিষয় এখানে বিবেচ্য।

প্রথমত, ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেঙে যাওয়ার পথে যাবে বলে মনে হয় না। কুর্দি ও বালুচ জনগোষ্ঠী নিয়ে কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলেও আজারিদের মতো বড় জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেও আজারি।

দ্বিতীয়ত, দেশের বাইরে অবস্থানকারী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভি, জনগণকে সরকার পতনের আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা দেশে নেই এবং ভেতরে তাঁদের সমর্থনের মাত্রা স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানি প্রবাসীদের মধ্যে পাহলভির প্রভাব রয়েছে, যা ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।

খামেনির মৃত্যুর পরও ইরানের শাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন হয়তো ভুলে যাওয়া সহজ হবে না। জানুয়ারির বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। বিভিন্ন হিসাবে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার তরুণ নিহত হয়েছেন বলে দাবি উঠেছে, যা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। ইরানিদের ভেতরেই প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষাও তাই ছিল প্রবল।

তৃতীয়ত, খামেনির অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথে একটি বড় বাধা সরে গেছে। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকেই স্পষ্ট ছিল যে খামেনির ‘দেরি করা ও এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল’ কার্যকর হয়নি। খামেনি মারা যাওয়ার আগে আলী লারিজানিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এখন লারিজানি ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সামনে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা চান, তা হলো ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা। এর সঙ্গে রাজনৈতিক উন্মুক্ততা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রক্রিয়া যুক্ত করার দাবিও রয়েছে। সমালোচনা সত্ত্বেও ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে ধারাবাহিক ছিলেন। তিনি সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং বিকল্প পথও রেখেছেন। খামেনি সেই পথ নেননি। এখন লারিজানি ও পেজেশকিয়ান জানেন, তাঁদের সামনে শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ প্রশ্নে বড় সিদ্ধান্তের সময় এসেছে।

চতুর্থত, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কয়েক বছর ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও তেল ক্রেতা। ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে ব্যবহৃত নজরদারি প্রযুক্তি চীন সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ইরানি ড্রোন ব্যবহার করেছে। বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই দুই দেশের আঞ্চলিক প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইরান কীভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে

পঞ্চমত, তেল ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকতে পারে। আঞ্চলিক তেল স্থাপনায় হামলার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

সবশেষে, খামেনির মৃত্যুর পরও ইরানের শাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন হয়তো ভুলে যাওয়া সহজ হবে না। জানুয়ারির বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়। বিভিন্ন হিসাবে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার তরুণ নিহত হয়েছেন বলে দাবি উঠেছে, যা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। ইরানিদের ভেতরেই প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষাও তাই ছিল প্রবল।

সম্প্রতি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের বাড়িঘর বা সম্পত্তিতে লাল রং দিয়ে চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের চিহ্ন দেওয়া হয় কাউকে চিহ্নিত বা লক্ষ্যবস্তু বানানোর উদ্দেশ্যে।

এটি প্রতিশোধের সম্ভাবনা বা জনরোষের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এতটাই বেড়েছে যে কেউ কেউ ভবিষ্যতে হামলা বা প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন বার্তাই এতে বোঝা যায়।

ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন ইরানিরাই। খামেনির মৃত্যুর পর এ ছাড়া সেখানে আর কোনো পথ নেই।

  • প্যাট্রিক গিবন্স তেহরানে অ্যাস্ট্রেলিয়ার সাবেক কূটনৈতিক

    অস্ট্রেলিয়ান ফিন্যানশিয়াল রিভিউ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source