যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল কেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হামলার নিশানা করছে

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু করেছে। এই হামলার ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনা আবারও মুখ থুবড়ে পড়েছে। অন্যদিকে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও নেতৃত্বকে নিশানা করার যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Visit goldparty.lat for more information.

আজ শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানে যেসব এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোও ছিল।

কোথায় কোথায় হামলা হলো

ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আজ তেহরানসহ ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ জানিয়েছে, তেহরানের উত্তরে শেমিরানে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিকটবর্তী এলাকা এবং খামেনির বাসভবনের (কম্পাউন্ড) কাছে সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীতে খামেনির দপ্তরের কাছাকাছি কয়েকটি এলাকায়ও হামলা চালানো হয়েছে।

তেহরানে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উড়তে দেখা যাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

খামেনি কোথায় আছেন

খামেনি কোথায় আছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, খামেনি বর্তমানে তেহরানে নেই। তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কে এই খামেনি

৮৬ বছর বয়সী এই ইসলামি পণ্ডিত ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির স্থলাভিষিক্ত হন। খোমেনি নির্বাসন থেকে ফিরে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন।

সরকারের সব শাখা, সেনাবাহিনী এবং বিচার বিভাগের ওপর চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখেন খামেনি। একই সঙ্গে তিনি দেশটির আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবেও স্বীকৃত।

খামেনির শাসনামলে পশ্চিমাদের সঙ্গে চরম বৈরী সম্পর্ক, তীব্র নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের অভ্যন্তরে অর্থনীতি ও অধিকার নিয়ে বেশ কয়েক দফা বড় ধরনের গণবিক্ষোভ হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের ‘এক নম্বর শত্রু’ বলে মনে করেন।

আলী হাশেম, সাংবাদিক, আল-জাজিরাএটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার প্রধান লক্ষ্য ইরানের রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করা

খামেনির ক্ষমতার মূল ভিত্তি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং আধা সামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’। দেশটির প্রধান এই দুই নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত সদস্যের বাইরে লাখ লাখ স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। এই দুই বাহিনীই খামেনির অনুগত।

খামেনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু বেসামরিক কাজের জন্য। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা বা জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন কোনো প্রমাণ পায়নি। তা সত্ত্বেও ইসরায়েল ও ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অংশ দাবি করে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।

খামেনি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কী বলেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এর আগেও খামেনিকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছেন।

গত বছরের জুন মাসে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত হয়। ওই সংঘাতের পর ইসরায়েলের উগ্রপন্থী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছিলেন, খামেনি ‘টিকে থাকতে পারেন না’। তাঁর ভাষায়, ‘খামেনির মতো একজন স্বৈরশাসক ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের প্রধান। ইসরায়েলকে ধ্বংস করা তাঁর (খামেনির) লক্ষ্য। এটি ভয়ংকর। তিনি টিকে থাকতে পারেন না।’

একই মাসে ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইসরায়েল খামেনিকে গুপ্তহত্যার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, এ পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের ‘অবসান’ ঘটাবে।

তেহরানের একটি দেয়ালে আঁকা দেয়ালচিত্রে লেখা ‘ডাউন উইথ দ্য ইউএসএ’ বা যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও খামেনিকে হুমকি দিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। চলতি মাসের শুরুতে এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ফলে ইরানি নেতার ‘খুব চিন্তিত’ হওয়া উচিত।

অন্য এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা’। বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়েই তিনি যোগ করেন, নেতৃত্ব নেওয়ার মতো ‘অনেক লোক সেখানে আছেন’।

গত বছর ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি খামেনিকে নিশানা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তিনি হবেন ‘সহজ নিশানা’।

ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই তথাকথিত সর্বোচ্চ নেতা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছেন, তা আমরা জানি। তিনি একটি সহজ লক্ষ্য এবং সেখানে (এখন পর্যন্ত) নিরাপদে আছেন। আমরা তাঁকে এখনই সরিয়ে দিচ্ছি না (হত্যা করছি না!), অন্তত এইবারের মতো।’

সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য কী ছিল

হামলার পর দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের নৌবাহিনী এবং বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ‘নিশ্চিহ্ন’ করার অঙ্গীকার করেন এবং ইরানের নাগরিকদের প্রতি বর্তমান সরকারকে উৎখাত করার আহ্বান জানান।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিন। এখন আপনাদের সুযোগ নেওয়ার পালা। আগামী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে সম্ভবত এটিই হবে আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’

দীর্ঘকাল ধরে ইরান নিয়ে প্রতিবেদন করছেন আল–জাজিরার সাংবাদিক আলী হাশেম। তিনি বলেন, এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার প্রধান লক্ষ্য ইরানের ‘রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করা’।

আলী হাশেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের এই লক্ষ্য সফল হবে কি হবে না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

Read full story at source