নিঃসঙ্গ বানর ছানা পাঞ্চ ও একটি খেলনা ওরাংওটাংয়ের গল্প
· Prothom Alo

জাপানের ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানার ছোট্ট বানর পাঞ্চ। এখন ইন্টারনেটে ভাইরাল এই বানর। আছে লাখ লাখ ভক্ত। বিশ্বজুড়ে যার তুমুল জনপ্রিয়তা। তবে এই জনপ্রিয়তার পেছনের গল্পটি মোটেও আনন্দের নয়; বরং খানিকটা আবেগের। ভাইরাল হওয়া রিলসে দেখা গেছে, ছোট্ট পাঞ্চ সারাক্ষণ একটি খেলনা পুতুল শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে; কিন্তু কেন ও এমন করছে?
Visit asg-reflektory.pl for more information.
পাঞ্চের জন্মের পরপরই ওর মা ওকে ত্যাগ করে। এরপর ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানার কর্মীরা ওকে পরম মমতায় লালন-পালন করতে থাকেন। সাধারণত বানর ছানারা আরাম আর নিরাপত্তার জন্য সব সময় মাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। পাঞ্চের যেহেতু মা নেই, তাই কর্মীরা ওকে একটি খেলনা ওরাংওটাং উপহার দেন। যেটা পাঞ্চের কাছে অনেকটা মায়ের মতো। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, পাঞ্চ যেখানেই যায়, খেলনাটি সঙ্গে নিয়ে যায়। এমনকি অন্য বানরেরা যখন ওকে তাড়িয়ে দেয় বা অবজ্ঞা করে, তখন ও মন খারাপ করে এই খেলনার কাছেই ফিরে আসে সান্ত্বনার খোঁজে।
বর্তমানে পাঞ্চকে চিড়িয়াখানার মাঙ্কি মাউন্টেনে রাখা হয়েছে। সেখানে সে অন্য ম্যাকাক বানরদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় জানাচ্ছে, পাঞ্চ নতুন এই পরিবেশে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। সারা বিশ্বে পাঞ্চের অসংখ্য ভক্ত থাকলেও সে এখন একা। কারণ, নিজের দলের অন্য বানরদের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয়, তা সে এখনো শিখে উঠতে পারেনি।
অতিরিক্ত শব্দ কি পাখিদের জীবন বদলে দিচ্ছেছোট্ট পাঞ্চ এখন ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে উঠেছে। ওর প্রিয় আইকিয়া ওরাংওটাং পুতুলটির চাহিদা এখন আকাশচুম্বী।
জাপানের সেই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, অন্য বানরদের মাধ্যমে পাঞ্চের হেনস্তা হওয়ার ভিডিওগুলো সত্য। তবে তারা বলছে, এটি পাঞ্চের বড় হয়ে ওঠারই একটি অংশ। যেহেতু ওর মা নেই, তাই তাকে নিজেই শিখতে হচ্ছে কীভাবে অন্য বানরদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
মাঝেমধ্যে পাঞ্চ ভয় পেয়ে চিড়িয়াখানার কর্মীদের পা জড়িয়ে ধরেঅন্য বানরদের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ার পর পাঞ্চ ভয়ে ওর প্রিয় খেলনা ওরাংওটাংটির কাছে ফিরে যায়। যখন ও আবার নিজেকে নিরাপদ মনে করে, তখন খেলনাটি রেখে আবার অন্য বানরদের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি মাঝেমধ্যে পাঞ্চ ভয় পেয়ে চিড়িয়াখানার কর্মীদের পা জড়িয়ে ধরে।
পাঞ্চের এই কাহিনি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ছোট এই চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীর ভিড় উপচে পড়ছে। সামনের ছুটির দিনগুলোতে ভিড় আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। পরিস্থিতি সামলাতে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়েবসাইটে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে, যেন দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার করে।
ছোট্ট পাঞ্চ এখন ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে উঠেছে। ওর প্রিয় আইকিয়া ওরাংওটাং পুতুলটির চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াতেও এই খেলনার স্টক ফুরিয়ে গেছে। পুতুল তৈরির প্রতিষ্ঠান আইকিয়া কর্তৃপক্ষ পাঞ্চের এই গল্পে আবেগাপ্লুত। তারা জানিয়েছে, এই পুতুল যে একটি অনাথ বানর ছানাকে মায়ের মতো মানসিক প্রশান্তি দিচ্ছে, তা দেখে তারা সত্যিই মুগ্ধ। আইকিয়া এখন পুতুলটিকে পাঞ্চের ওরাংওটাং পুতুল হিসেবে প্রচার করছে।
এশিয়ার আমাজনে গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ল ৯ বিরল প্রাণীআগে মনে করা হতো, অতিরিক্ত আদর শিশুদের নষ্ট করে দেয়; কিন্তু হার্লো দেখালেন, আবেগপ্রবণ চাহিদা পূরণ করা না হলে শিশুরা সামাজিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।
তবে এই ঘটনা জীববিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৫০-এর দশকের একটি বিখ্যাত ও বিতর্কিত পরীক্ষার কথা। আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী হ্যারি হার্লো রিসাস বানরদের ওপর সেই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিশুদের বড় হওয়ার জন্য খাবারের মতো স্নেহ ও স্পর্শও সমানভাবে জরুরি। সেই পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, শিশু বানর দুধ পান করার জন্য তারের তৈরি কৃত্রিম মায়ের কাছে গেলেও একটু শান্তির জন্য নরম কাপড়ের তৈরি মায়ের কাছেই ফিরে আসত।
হার্লোর সেই পরীক্ষাগুলো তৎকালীন শিশু লালন-পালনের ধারণাই বদলে দিয়েছিল। আগে মনে করা হতো, অতিরিক্ত আদর শিশুদের নষ্ট করে দেয়; কিন্তু হার্লো দেখালেন, আবেগপ্রবণ চাহিদা পূরণ করা না হলে শিশুরা সামাজিকভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। পাঞ্চের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। ওর মা নেই বলে সে সামাজিক পরিবেশ বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে। ভয় পেলেই সে দৌড়ে সেই খেলনা মায়ের কাছে ফিরে যায়।
সামাজিক বন্ধন কেবল মানুষের জন্য নয়, প্রাণীদের দীর্ঘায়ু হওয়ার জন্যও জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে পাঞ্চকে দত্তক নিতে চাইলেও সেটি আসলে সঠিক সমাধান নয়। পাঞ্চকে বানরের মতো জীবনযাপন করতেই শিখতে হবে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষও একই কথা বলেছে। তারা চান, মানুষ পাঞ্চের জন্য দুঃখ না পেয়ে ওর এই স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টাকে খারাপ ভাবে না দেখেন।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট, ইউরো নিউজজাতে বিড়াল, ডাকে কুকুরের মতো