ঠিকানা নরহরিপুর
· Prothom Alo

যাচ্ছিলাম নরহরিপুর।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আমার খালার বাড়ি। আর মাসুক ভাইয়ের হুক্কুর বাড়ি। মাসুক ভাই ফুফুকে বলেন হুক্কু। সে হিসেবে ফুফাকে হুক্কা ডাকার কথা। কিন্তু কী অবাক! মাসুক ভাই ফুফাকে ডাকেন হুয়াজি।
শাহরাস্তি থেকে নরহরিপুর অনেকটাই দূর। সড়কপথে গেলে ১৪ কিলোমিটার। আর জমির আইলের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে অনেকটা কম। ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগে। আমি আর মাসুক ভাই সকাল সকাল হেঁটেই রওনা দিলাম।
অগ্রহায়ণ মাস। আকাশ থাকার কথা ঝকঝকে পরিষ্কার। কিন্তু ভোর থেকেই আকাশজুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা। চারপাশে আলো-আঁধারি। অন্য রকম সুন্দর। একটু পরপর এক–দুই পশলা করে হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসে কাঁপুনি নেই, তবে একটু হিম হিম ভাব আছে।
মাসুক ভাই জোরকদমে পা চালিয়ে আগে আগে হেঁটে চলেছেন। যেন আমরা হাঁটার প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আমিও মাসুক ভাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বেশিক্ষণ পারিনি। মাসুক ভাই আমার থেকে অনেক অনেক এগিয়ে আছেন। আমি মাসুক ভাইয়ের দিকে নজর রেখে আমার মতো হাঁটছি। চলতে চলতে একসময় হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি, মাসুক ভাই নেই!
ঝোপটায় নানা ধরনের গাছপালা। কেবল নারকেল ছাড়া প্রায় সব গাছই আমার অচেনা। কয়েকটা মসজাতীয় গাছ চোখে পড়ল। ওগুলোর ছবি আগে দেখেছি বলে চিনতে পেরেছি।
আশপাশে তাকালাম। চারপাশে খোলা মাঠ। মাঠজুড়ে ধানগাছ। বাতাসে দোলাদুলি করছে। বেশির ভাগই পাকা। আবার কিছু কিছু মাঠ একেবারে ন্যাড়া। ধান কাটা হয়েছে বেশি দিন হয়নি।
হাঁটতে হাঁটতে বড়সড় একটা ঝোপের কাছে এসে পড়লাম আমি। সর্বশেষ মাসুক ভাইকে ওই ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। তাহলে কি মাসুক ভাই ঝোপের ভেতর ঢুকেছেন?
ঢুকতেই পারেন। ঝোপে সারার মতো কাজের তাড়া থাকতেই পারে। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কিছু। নরহরিপুরের পথটা কি ঝোপের ভেতর দিয়েই গেছে?
জর্জ আর আর মার্টিনের সায়েন্স ফিকশন—আশাহতে পারে। সংক্ষিপ্ত পথটা আমার নয়, মাসুক ভাইয়ের চেনা। আমি তো মাসুক ভাইয়ের দেখানো পথেই এতক্ষণ হাঁটছিলাম। ঝোপের সামনে এসে দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ঝোপে ওঠার পথ দুটো। দুটো পথ দুদিকে বেঁকে চলে গেছে। কোন পথে যাব আমি?
জোরে একটা হাঁক দিলাম।
মাসুক ভাই!
কোনো সাড়া পেলাম না।
ঝোপটায় নানা ধরনের গাছপালা। কেবল নারকেল ছাড়া প্রায় সব গাছই আমার অচেনা। কয়েকটা মসজাতীয় গাছ চোখে পড়ল। ওগুলোর ছবি আগে দেখেছি বলে চিনতে পেরেছি। প্রচুর লতানো গাছ। বৃক্ষজাতীয় গাছগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে রেখেছে। ঝোপটাকে খুব একটা ভয়ংকর বা বিপজ্জনক মনে হলো না। সাপ আছে কি না, কে জানে। আমি আবার সাপ খুব ভয় পাই।
আবারও ঝোপে ওঠার পথটার দিকে তাকালাম। কিন্তু কোথায় পথ? একটু আগেও দুটো পথ দেখেছিলাম। এখন একটা পথও দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এ কী! শুধু পথ নয়, আমার চোখের সামনে থেকে ঝোপটাই হঠাৎ ঝাপসা হতে শুরু করল। ধীরে ধীরে আমি আর কিছুই দেখতে পেলাম না। হঠাৎ আমার চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেল।
বেশ অবাক হলাম। বৃষ্টি হলে কখনো কখনো কুয়াশার মতো জ্বলীয়বাষ্প জমে থাকে। তাই বলে এতটা ঘন! যদিও তখনো বৃষ্টি নামেনি।
কুয়াশা যতই ঘন হোক, আমি পাত্তা দিলাম না। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তবু জোরে জোরে পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। আর হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশা কেটে গেল। ঠিক যেভাবে এসেছিল, তেমনি হঠাৎ করেই কুয়াশা হারিয়ে গেল। কুয়াশা কেটে যাওয়ায় ভীষণ খুশি হলাম। কিন্তু এ কী! কোথায় এলাম আমি?
চারপাশে তাকালাম। দিগন্তবিস্তৃত কেবল ফসলের জমি। কিন্তু ঝোপটা আর দেখতে পেলাম না। আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।
বেশ কিছুটা দূরে দুজনকে মাঠে কাজ করতে দেখলাম। ছুটে গেলাম ওদিকে।
একজন দুহাতে খড়ের গোলা বানিয়ে ছুড়ে মারছেন ওপরে। আরেকজন খড়ের উঁচু গাদার ওপর দাঁড়িয়ে সেই গোলা ধরছেন। তারপর গোলার খড়গুলো বিছিয়ে গাদাটাকে আরও উঁচু করছেন।
‘শুনছেন?’
আমার দিকে ঘাড় ঘোরালেন দুজন। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। আমিও অবাক হলাম। আমার দিকে এভাবে অবাক হয়ে তাকানোর কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না।
নিচের লোকটি জানতে চাইলেন, ‘বলুন!’
দক্ষিণ দিকেই আছে চারটা নরহরিপুর। একটা চাটখিলের। একটা সেনবাগের। একটা সোনাইমুড়ির। আর একটা রামগঞ্জের। উত্তর দিকে আছে একটা নরহরিপুর।
তাঁরা দুজনই দেখতে আমার ছোট চাচার বয়সী। ছোট চাচা আমার চেয়ে পনেরো-ষোলো বছরের বড়। তা ছাড়া এখনো আমার দাড়ি-গোঁফ ওঠেনি। কেবল রেখা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তাঁদের দুজনের মুখেই কয়েক দিনের না কামানো দাড়ি আর গোঁফ। হয়তো আমি শহুরে বলেই ‘আপনি’ করে বলছেন।
আমি মুচকি হেসে বললাম, ‘আমাকে তুমি করেই বলবেন। আমি আপনাদের চেয়ে অনেক ছোট।’
আমার কথা শুনে তাঁরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসি দিলেন।
আমার একটু রাগই হলো। বলতে চাইলাম, আমি কি হাসির কিছু বলেছি?
বললাম না। জানতে চাইলাম, ‘নরহরিপুর কোন দিকে?’
এবারও দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকালেন। আমি দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি জবাবের আশায়।
মাটিতে দাঁড়ানো লোকটি বললেন, ‘কোন নরহরিপুর?’
ঘাবড়ে গেলাম আমি। তাই তো? কোন নরহরিপুর?
বললাম, ‘কোন নরহরিপুর মানে? এখানে কয়টা নরহরিপুর আছে?’
গাদার ওপরের লোকটি বললেন, ‘সাতটা।’
‘সাতটা!’ চমকে উঠলাম আমি। বললাম, ‘এখানে এতগুলো নরহরিপুর এল কোত্থেকে?’
‘নানান জায়গা থেকে এসেছে। দক্ষিণ দিকেই আছে চারটা নরহরিপুর। একটা চাটখিলের। একটা সেনবাগের। একটা সোনাইমুড়ির। আর একটা রামগঞ্জের। উত্তর দিকে আছে একটা নরহরিপুর। ওটা লাকসামের। পূর্ব দিকে আছে নাঙ্গলকোটের নরহরিপুর। পশ্চিমে কোনো নরহরিপুর নেই। আপনি কোন দিকের নরহরিপুরে যাবেন?’
‘আপনি তো ছয়টা নরহরিপুরের হিসাব দিলেন। আরেকটা?’
‘আরেকটা মনোহরগঞ্জের নরহরিপুর।’
‘আমি ওই নরহরিপুরেই যাব।’
‘এটাই সেই নরহরিপুর। আপনি সঠিক জায়গাতেই আছেন। কোন পাড়া?’
‘নন্দীপাড়া।’
‘আরে! আমাদের বাড়িও তো নন্দীপাড়া। নন্দীপাড়া কার বাড়ি?’
খুশিতে আমার বুকটা ডাকাতিয়া নদীর ঢেউয়ের মতো ছলাৎ করে উঠল। ডাকাতিয়া নদীটা মনোহরগঞ্জের ওপর দিয়েই বয়ে গেছে।
বললাম, ‘আমার খালার বাড়ি।’
শিবব্রত বর্মনের গল্প—মল্লিকদের বাড়িএবার হো হো করে হেসে উঠলেন দুজন। তখনই হঠাৎ কোত্থেকে এক থুত্থুড়ে বুড়ো উদয় হলেন লাঠিতে ভর দিয়ে। লোক দুটোকে ধমকাতে লাগলেন, ‘সময় নষ্ট করিস নারে! শিগগির খড়গুলো নাড়ায় তুলে ঢেকে দে। যেকোনো সময় বৃষ্টি আসতে পারে। ঠান্ডা বাতাস ছুটেছে। টের পাচ্ছিস না?’
বলেই যেভাবে উদয় হয়েছিলেন, সেভাবেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ইশারায় আমাকে রাস্তাটা দেখিয়ে দিলেন। তারপর আবার খড়ের গোলা বানাতে শুরু করলেন।
লোকটির দেখিয়ে দেওয়া রাস্তার ওপর এসে দাঁড়ালাম আমি। কিছুটা অবাকও হলাম। রাস্তাটা পাকা হলো কবে! গত বছরও কাঁচা মাটির রাস্তা দেখেছিলাম। কাঁচা মাটির এই রাস্তাই শাহরাস্তি থেকে এখানে এসেছে। ওখানে তো পাকা রাস্তা দেখিনি! তবে কি শুধু এদিককার রাস্তাটাই পাকা হয়েছে? হতে পারে।
কাঁচা-পাকা যা-ই হোক, রাস্তাটা খুবই সরল। কোথাও বাঁক নেই। মাত্র চার-পাঁচ মিনিটে আমি খালার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু বাড়িটা চেনার জন্য স্মৃতির অনেকগুলো পাতা ওলটাতে হয়েছে। বাড়িটা তো চিনতে পারলাম। কিন্তু এ কী!
গত বছরও আমি খালার বাড়িতে এসেছিলাম। নতুন বানানো বাড়িটায় খালারা তখন কয়েক দিন হলো উঠেছিলেন। সদর দরজার সামনের দিককার উঠানে কয়েকটা চারা গাছ দেখেছিলাম। এক বছরে গাছগুলো এত বিশাল হয়ে গেল!
দ্বিধায় পড়লাম আমি। এটা খালার বাড়ি তো!
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাড়িটা দেখতে লাগলাম।
পাকা দালান। দোতলা। দোতলার চারপাশেই চারটা টানা লম্বা বারান্দা। বাড়ির সামনের দিকে মার্বেল দিয়ে নকশা করা। হ্যাঁ। এটাই তো সেই বাড়ি। তবে নামফলকের জায়গাটা তখনো খালি ছিল। এখনো খালিই আছে। কিন্তু বাড়িটা এত জীর্ণ হলো কী করে? তবে কি খালা আর এ বাড়িতে থাকেন না?
সদর দরজার সামনে গিয়েও হোঁচট খেলাম। দুই পাল্লার বিশাল কাঠের দরজা। দরজাটা জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গেছে। আর কড়া নাড়তে গিয়ে দেখলাম, কড়াগুলোও ক্ষয়ে গেছে জং ধরে।
ক্ষয়ে যাওয়া কড়া দুটো নাড়ালাম। খুব একটা শব্দ হলো না। এবং কোনো সাড়াও মিলল না। এবার জোরে জোরে কড়া নাড়লাম। শব্দ খুব একটা বাড়েনি, তবে ভেতর থেকে সাড়া পাওয়া গেল। কড়ার মতোই খুব দুর্বল কণ্ঠ, ‘কে?’
আবার রাস্তার ওপর এসে দাঁড়ালাম। চৌদ্দ কিলোমিটার হেঁটে এসেছি। আরও চার কিলোমিটার হাঁটতে হবে! ভাবতেই ক্লান্তিটা আরও জেঁকে ধরল। পা দুটো যেন আর চলতে চাইছে না।
বলতে বলতেই দরজা খুলল একটি মেয়ে। আমার বয়সী মেয়েটাকে দেখে লজ্জা পেলাম। কিন্তু আমাকে দেখে মেয়েটি একটুও লজ্জা পেল না। জানতে চাইল, ‘কাকে চাইছেন, আঙ্কেল?’
আঙ্কেল! মানে চাচা! কিংবা মামা। যা–ই হোক না কেন, আমাকে আঙ্কেল কেন বলল?
আমি গম্ভীর মুখে বললাম, ‘এটা কি সফুরা খালার বাড়ি?’
‘আগে ছিল, এখন নেই।’
অবাক হলাম, ‘মানে!’
‘অনেক বছর আগে এ বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছেন।’
‘কোথায় গেছেন?’
‘ঠিক জানি না। তবে শুনেছি, এ রাস্তা ধরে চার কিলোমিটার পূর্বের আরেকটা বাড়িতে উঠেছেন। জায়গার নাম চিতৌষি।’
আমি হতাশ হলাম। এসব কী হচ্ছে, বুঝতে পারছি না। ভীষণ ক্লান্তি পেয়ে বসল আমাকে। তবু ধীরে ধীরে পা ফেলে বেরিয়ে এলাম বাড়ির আঙিনা থেকে।
আবার রাস্তার ওপর এসে দাঁড়ালাম। চৌদ্দ কিলোমিটার হেঁটে এসেছি। আরও চার কিলোমিটার হাঁটতে হবে! ভাবতেই ক্লান্তিটা আরও জেঁকে ধরল। পা দুটো যেন আর চলতে চাইছে না। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিয়েছে। কিছুটা হাঁটার পর পথের পাশেই একটা পুকুর দেখলাম। টলটলে পুকুর। পুকুরের চারপাশজুড়ে একসারি নারকেলগাছ। বিশাল বিশাল গাছে নারকেল ঝুলে আছে।
রাস্তার ধারেই পুকুরের একমাত্র ঘাটলা। তবে ভাঙাচোরা। দেখলেই বোঝা যায়, একসময় পাকা ছিল। চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে হবে। তাহলে হয়তো ক্লান্তি কিছুটা কমবে।
ঘাটলার ভাঙা সিঁড়ি মাড়িয়ে পানির নাগালে চলে এলাম। পুকুরের টলটলে পানিতে তাকাতেই চমকে উঠলাম। এ আমি কাকে দেখছি!
কাজী শাহনূর হোসেনের গল্প—অন্য ভুবনদুহাতে আঁজলা ভরে পানি নিয়ে চোখেমুখে ঝাপটা দিলাম। কয়েকবার। প্রতিবার ঝাপটা দেওয়ার পর পানিতে তাকিয়ে দেখছি। কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। পুকুরের পানিতে যার প্রতিচ্ছবি দেখছি, এটা আমি! মনে হলো যেন বারো বছর পরের আমিকে দেখতে পাচ্ছি আমি। এটা কীভাবে হলো?
মুহূর্তে আমার ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেল! ভাঙা আর পিচ্ছিল ঘাটলার ধাপ পেরিয়ে রাস্তায় উঠে এলাম। হনহন করে পূর্ব দিকে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু পা দুটো যেন চলতেই চাইছে না। তবু পা টেনে টেনে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ হোঁচট খেলাম কিছুর সঙ্গে। নিজেকে সামলে নিলাম অনেক কষ্টে। কতটা পথ পেরিয়েছি, দেখার জন্য পেছনে তাকালাম। আর পেছনে তাকিয়ে অবাক হলাম ভীষণ।
কিছুক্ষণ আগে ঠিক যে রকম ঘন কুয়াশা আমাকে ঘিরে রেখেছিল, তেমনি ঘন এক কুয়াশার মেঘ ছুটে আসছে আমার দিকে। ওই ঘন কুয়াশার মেঘ থেকে বেরোনোর পরই যত সব অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে আমার সঙ্গে। আমি ঘাবড়ে গেলাম। কুয়াশার মেঘ আমার পিছু নিয়েছে। রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে পড়লাম। মাঠে নেমেই ছুটতে শুরু করলাম। অবাক হলাম। আমার দুপায়ে এত শক্তি এল কোত্থেকে?
কিন্তু কুয়াশার মেঘখণ্ডটা আমার চেয়ে জোরে ছুটে আসছিল। আমাকে তাড়া করছিল পাগলা কুকুরের মতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়াশার গতির কাছে হেরে গেলাম আমি। নিজেকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার রইল না আমার। কারণ, আমি আর জোর পাচ্ছিলাম না। পা ফেলতেও কষ্ট হচ্ছিল। ঘন কুয়াশার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।
কিন্তু এ কী! আমার চোখের সামনে দিয়ে কুয়াশার মেঘটা যাচ্ছে। বিশাল মেঘখণ্ডটা যতই এগোচ্ছে, ততই ছোট হচ্ছে। অবাক বিস্ময়ে আমি কুয়াশামেঘের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
‘তুই এখানে?’
চমকে পেছনে ফিরে তাকালাম। সেই ঝোপ। খুশিতে চিত্কার দিয়ে উঠলাম, ‘মাসুক ভাই!’
‘এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল!’
এক বছরে যতটা বড় হওয়া যায়, সদর দরজার সামনের গাছগুলো ঠিক ততটাই বড় হয়েছে। সদর দরজারও তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি।
বলেই ঝোপের ভেতর ঢুকে পড়লেন মাসুক ভাই। তাঁর পেছন পেছন আমিও হাঁটতে লাগলাম। ছোট্ট ঝোপ। ওই ঝোপ পেরোতে দুমিনিটও লাগেনি। ঝোপ পেরিয়ে রাস্তায় উঠলাম। আর রাস্তায় উঠেই অবাক হলাম। কাঁচা মাটির রাস্তা! কিন্তু রাস্তার পাশে তাকাতেই আমার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সেই পুকুর! একটু আগে এই পুকুরে নেমেই তো চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়েছিলাম।
পুকুরের চারপাশে নারকেলগাছ। তবে গাছগুলো তখনো চারা। পুকুরের ঘাটলার ধাপগুলো পাকা। কোথাও ভাঙা নেই। আমি অবাক হয়ে পুকুরটা দেখছিলাম।
মাসুক ভাই বললেন, ‘এই পুকুরের পানি খুব ঠান্ডা।’
বলেই মাসুক ভাই টপাটপ সিঁড়ি টপকে পুকুরে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে দেখ। খুব আরাম! পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।’
আমি পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর ভীষণ কৌতূহল নিয়ে নিচে তাকালাম। এ আমি কী দেখছি?
শাহরাস্তি থেকে রওনা দিয়েছিলাম যে আমি, সেই আমি। বারো বছর পরের নয়, বর্তমানের আমি!
খালার বাড়ির সামনে এসে আরেকটা হোঁচট খেলাম। গত বছর যেমন দেখেছিলাম, অনেকটা সে রকমই আছে বাড়িটা। এক বছরে যতটা বড় হওয়া যায়, সদর দরজার সামনের গাছগুলো ঠিক ততটাই বড় হয়েছে। সদর দরজারও তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। এমনকি কড়া দুটোও গত বছরের মতোই আছে। কোথাও জং ধরা নেই।
আমি কড়া নাড়লাম। ভীষণ জোরে শব্দ হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে সাড়া এল, ‘কে?’
খালার কণ্ঠ!
কাজী শাহনূর হোসেনের গল্প—অন্য ভুবন