আমেরিকার মাগা অনুসারীদের ইউরোপ নীতি বদলায়নি
· Prothom Alo

গত বছরের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমন সব কথাবার্তা বলেছিলেন, যা কিনা নাটকীয়তা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার দিক থেকে তাঁর রাজনৈতিক বস ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেই মানানসই ছিল। ওই সম্মেলনে ভ্যান্স ট্রান্স-আটলান্টিক আদবকায়দার প্রচলিত রেওয়াজ-রীতি ভেঙে দেন। আগের মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টরা যেভাবে কূটনৈতিক সৌজন্য মেনে বক্তব্য দিতেন, তিনি সেসব সৌজন্যের ধারেকাছেও ছিলেন না।
এবারের সম্মেলনে মার্কিন প্রতিনিধিদলের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি—পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ এ. কলবি তাঁদের বক্তব্যে ট্রাম্পের নীতির দুই ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। দুজনের কথাই আলাদাভাবে দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে ইউরোপকে কী ধরনের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। বাহ্যিকভাবে কলবির বক্তব্যই বেশি সরাসরি চ্যালেঞ্জের মতো শোনায়। কঠোর বাস্তববাদী এই কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ পদমর্যাদার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা। মার্কিন সেনা কোথায় ও কীভাবে মোতায়েন হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তাঁর।
Visit librea.one for more information.
দীর্ঘদিনের মাগা পর্যবেক্ষকদের কাছে দূত নির্বাচনের এই কৌশল বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু কলবি ও রুবিও দুজনেই ট্রাম্পের বিশ্বস্ত সহচর। তাঁরা মূলত প্রেসিডেন্টের সহজাত প্রবৃত্তিনির্ভর নীতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভার ও সুসংহত রূপ দেওয়ার কাজটি করছেন। ট্রাম্প মঞ্চ ছাড়ার পরও রিপাবলিকান পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁদের প্রভাব বজায় থাকবে। বিশেষত রুবিওর প্রভাব টিকে থাকবে। কারণ, তাঁর স্পষ্টই প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
সম্মেলনে আমি একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব সঞ্চালনা করেছিলাম। সেখানে কলবি বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার আর কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ নেই, যার ওপর দাঁড়িয়ে তারা একসঙ্গে পথ চলতে পারে। তাঁর মতে, সম্মেলনের সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় নাকি ছিল ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ শব্দবন্ধটি মাত্র দুবার উচ্চারিত হয়েছে।
কলবি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার বিস্তৃত পারমাণবিক প্রতিরোধ প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য হলো, ইউরোপ যেন নিজ মহাদেশের প্রচলিত প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিজের হাতে নেয়। তিনি জার্মানি ও পোল্যান্ডের সামরিক ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ইউক্রেন নিয়ে ট্রাম্পের আলোচনাপদ্ধতি, গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে হুমকি এবং ট্রান্স-আটলান্টিক উত্তেজনার অন্যান্য উৎস নিয়েও কথা বলেন। তাঁর যুক্তি, ‘একটা নির্দিষ্ট মাত্রার উদ্বেগ উপকারী। আপনি যদি কখনো প্রায় মৃত্যুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন…তাহলে আপনি খাদ্যাভ্যাস বদলাবেন, ঠিকমতো ওষুধ খাবেন এবং সময়মতো ব্যায়াম করবেন।’
কলবি ইউরোপকে অস্বস্তিতে ফেলার প্রয়োজনীয়তার কথা দৃঢ়ভাবে বললেও ইউরোপ ও আমেরিকার অবিচ্ছেদ্য সভ্যতাগত সম্পর্কের প্রশস্তি গেয়ে রুবিও তাঁর শ্রোতাদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুতে একবার ট্রাম্পকে ‘ড্যাডি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর উল্টো সুরে রুবিও বলেছেন, আমেরিকা ‘সব সময় ইউরোপের সন্তান’ হয়ে থাকবে। এরপর তিনি দীর্ঘ বক্তৃতায় পশ্চিমা অভিন্ন ঐতিহ্যে ইউরোপের অবদানের কথা বলেন। তিনি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নতুন বিশ্ব আবিষ্কার, আমেরিকায় স্কটস-আইরিশ বসতকারীদের সীমান্তচেতনা ও খ্রিষ্টধর্মের বিশ্বাস নিয়ে কথা বলেন—এমনকি জার্মান বিয়ার পর্যন্ত তাঁর আলোচনায় উঠে আসে।
সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক আলোচনার পর রুবিও শ্রোতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, আমেরিকা কখনোই ইউরোপকে ছেড়ে যাবে না। তাঁর ভাষায়, ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক হলো ‘রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গভীর বন্ধনের প্রতিফলন।’
রুবিওর এই বক্তব্যে উপস্থিত শ্রোতারা দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান। রুবিওর পরই বক্তব্য দেন সম্মেলনের চেয়ারম্যান উলফগ্যাং ইশিঙ্গার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিককে তাঁর ‘আশ্বস্তকারী’ বার্তার জন্য ধন্যবাদ জানান। অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেনও নিজের বক্তব্যে রুবিওর ভাষণের ইতিবাচক দিক উল্লেখ করেন। কিন্তু বাস্তবে রুবিওর বার্তাই ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য কলবির বক্তব্যের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক।
কারণ, রুবিও যে ইউরোপের প্রশংসা করেছেন, তা আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়; অর্থাৎ বর্তমান সংস্থা, নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রপ্রধানদের আভিজ্ঞান অনুযায়ী পরিচালিত ইউরোপ নয়; বরং রুবিও যে ইউরোপের কথা চিন্তা করেছেন, তা হলো জাতিগত ও জাতীয়তাবাদী ইউরোপ। এই ইউরোপ উত্থানশীল কট্টর ডানপন্থী বা জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর স্বপ্নের ইউরোপ।
ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তাকৌশল অনুযায়ী, এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তিগুলোই আমেরিকার সমর্থন পেতে পারে; অর্থাৎ রুবিও ইউরোপের বর্তমান সরকার বা নীতি নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে ডানপন্থী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোপকে এগিয়ে দেখছেন। সেই অনুসারে মার্কিন সমর্থনও তাঁর দিকে থাকবে—এটাই ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
কলবি ইউরোপকে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার সমাপ্তি মেনে নিতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ বাস্তবতা বুঝতে যে ৩৪ কোটি আমেরিকান চিরকাল ৫০ কোটি ইউরোপীয়র নিরাপত্তার ভার বহন করবে না। তবে তিনি এটাও পরিষ্কার করেন, পরিণত ও স্বনির্ভর এক ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই থাকতে পারে। কিন্তু রুবিওর বার্তার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত ছিল আরও অশুভ। তিনি যেন এক নতুন ‘সভ্যতাগত আটলান্টিকতাবাদ’-এর কল্পনা করছেন, যেখানে ইউরোপের সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান নির্ভর করবে ইউরোপীয় সরকারগুলো কতটা মাগা ও অতি ডানপন্থী মতাদর্শের কাছাকাছি, তার ওপর। ভ্যান্সের মতো তিনিও পরোক্ষভাবে শাসনব্যবস্থা বদলের পক্ষেই সওয়াল করছেন।
দীর্ঘদিনের মাগা পর্যবেক্ষকদের কাছে দূত নির্বাচনের এই কৌশল বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু কলবি ও রুবিও দুজনেই ট্রাম্পের বিশ্বস্ত সহচর। তাঁরা মূলত প্রেসিডেন্টের সহজাত প্রবৃত্তিনির্ভর নীতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভার ও সুসংহত রূপ দেওয়ার কাজটি করছেন। ট্রাম্প মঞ্চ ছাড়ার পরও রিপাবলিকান পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁদের প্রভাব বজায় থাকবে। বিশেষত রুবিওর প্রভাব টিকে থাকবে। কারণ, তাঁর স্পষ্টই প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
ইউরোপীয়দের উচিত, দুজনের কথাই মনোযোগ দিয়ে শোনা। রুবিওর মধুর আহ্বানে বিভ্রান্ত না হয়ে, কলবির ‘শক থেরাপি’কেই কার্যকর হতে দেওয়া তাদের জন্য বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত