অনলাইনে ভাগে কোরবানি দেওয়া: ইসলাম কী বলে

· Prothom Alo

সময়ের পরিবর্তনে কেনাকাটা এখন হাতের মুঠোয়। বিশেষ করে শহুরে ব্যস্ততা এবং প্রবাসীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির পাশাপাশি ‘ভাগে’ কোরবানি দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু পশু বিক্রি নয়, বরং ক্রেতার হয়ে পশু জবাই করা থেকে শুরু করে গোশত গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও নিচ্ছে। ইসলাম এই আধুনিক ব্যবস্থাকে কীভাবে দেখে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

কোরবানির দায়িত্ব দেওয়া

ইসলামে নিজের কোরবানি নিজে করা উত্তম হলেও অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া বা ‘অর্ডার’ দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। একে ফিকহশাস্ত্রে ‘ওয়াকালাহ’ বা প্রতিনিধিত্ব বলা হয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি বিশ্বস্ত হয় এবং তারা ক্রেতার পক্ষ থেকে পশু কেনা ও জবাই করার দায়িত্ব নেয়, তবে তা জায়েজ। ফাতাওয়ায়ে শামি অনুসারে, ‘অন্যকে কোরবানি জবাই করার অনুমতি প্রদান করা বৈধ, চাই সে অনুমতি মৌখিক হোক বা কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হোক।’ (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/৩২৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

অংশীদারত্ব বা ভাগে কোরবানি

অনলাইনে অনেক সময় একটি গরুর সাতটি ভাগ আলাদা সাতজন ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত ব্যক্তি অংশ নিতে পারেন। জাবির (রা.) বলেন, ‘আমরা হোদাইবিয়ার বছর মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন আমরা একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮)
তবে শর্ত হলো, সব অংশীদারের নিয়ত হতে হবে ইবাদত। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

অনলাইন হাটে মিলছে গরু, ছাগল থেকে কসাইয়ের সন্ধান, যেসব সাবধানতা মানতে হবে

প্রবাসীদের পক্ষে কোরবানি

প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠিয়ে বা অনলাইন এজেন্সির মাধ্যমে কোরবানি দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান যদি দাবি করে যে তারা গোশত গরিবদের বিলিয়ে দেবে, তবে তা আমানত হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতগুলো তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)

গোশত বিতরণের দায়িত্ব

ক্রেতা যদি পুরো গোশত গরিবদের দিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেন, তবে প্রতিষ্ঠান তা করতে পারবে। ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে বলা হয়েছে, ‘কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, ধনী ও গরিবদের খাওয়ানো এবং সংরক্ষণ করা—সবই বৈধ।’ (নিজামুদ্দিন ও অন্যান্য, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩০০, মাকতাবায়ে রশিদিয়া, কোয়েটা, ১৯৮০)

অনলাইন প্ল্যাটফর্মের জন্য জরুরি সতর্কতা

অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শরিয়তের পূর্ণ পরিপালন নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে:
• পশুর বয়স: গরু বা মহিষের বয়স অন্তত দুই বছর এবং ছাগলের এক বছর হওয়া বাধ্যতামূলক (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৬৩)। অনলাইনে অনেক সময় বয়স লুকিয়ে ছোট পশু জবাইয়ের অভিযোগ ওঠে, যা কোরবানির জন্য অগ্রহণযোগ্য।
• ত্রুটিমুক্ত পশু: পশুর চোখ, কান, পা বা অন্য কোনো অঙ্গে বড় ধরনের ত্রুটি থাকা চলবে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু কোরবানি করা জায়েজ নয়: যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, যে অত্যন্ত অসুস্থ, যে লেংড়া এবং যে অতিশয় দুর্বল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৭)
• নির্ধারিত সময়: জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানির সময় (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)। এই সময়ের আগে বা পরে জবাই করলে কোরবানি হবে না (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৫)।

ক্রেতাদের সতর্কতা

অনলাইনে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারণা এড়াতে এবং ইবাদত কবুল হওয়ার স্বার্থে ক্রেতাদের বেশ কিছু বিষয় যাচাই করে নেওয়া উচিত:
১. বিশ্বস্ততা: প্রতিষ্ঠানটি নির্ভরযোগ্য কি না এবং অতীতে তাদের কার্যক্রম কেমন ছিল, তা যাচাই করা।
২. স্বচ্ছতা: পশুর ছবি বা ভিডিও এবং জবাইয়ের প্রমাণ (যেমন ভিডিও কল বা ভিডিও ক্লিপ) দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না।
৩. চুক্তি: পশুর ভাগ, চামড়ার টাকা এবং কসাই খরচসহ সব লেনদেন স্পষ্ট হওয়া উচিত। কসাইকে পশুর কোনো অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭১৭)।

সারকথা

অনলাইন এজেন্সিগুলো যদি বিশ্বস্ততার সঙ্গে শরিয়তের নিয়ম মেনে পশু ক্রয়, জবাই ও গোশত বণ্টন সম্পন্ন করে, তবে এই প্রক্রিয়ায় কোরবানি দিতে কোনো বাধা নেই। তবে সশরীর উপস্থিত থেকে কোরবানি দেওয়া এবং নিজের পশুর গোশত নিজ হাতে বণ্টন করার মধ্যে যে আধ্যাত্মিক তৃপ্তি ও সওয়াব রয়েছে, তা ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।

Read full story at source